পেনশন । রেজা তানভীর

পেনশন

রেজা তানভীর

 

কাসেম সাহেব রেলওয়েতে স্টেশন মাষ্টারের চাকরি করেছেন।দীর্ঘ ৩৬ বছরের চাকরি জীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনে স্টেশন মাষ্টারের চাকরি করে অবসর গ্রহণ করেছেন।অবসরের কিছুদিন পরেই হঠাৎ হার্টঅ্যাটাকে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।কাসেম সাহেব দুই ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে গেছেন।বড় ছেলে সোলায়মান ও একমাত্র মেয়ে সুমাইয়াকেই তিনি বিয়ে দিতে পেরেছিলেন।ছোট ছেলে তখনো পড়ছে…. কাসেম সাহেব মৃত্যুর অাগে তার সন্তান ও স্ত্রীদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা করে যেতে পারেননি।তিনি চাকরি শেষে পেনশন বাবদ এককালীন ত্রিশ লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন।অবসরের পরপরই মারা যাওয়ায় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারেননি,অবসরের পর মাত্র ছয় মাস বেঁচেছিলেন। কাসেম সাহবের বড় ছেলে সোলায়মান তার মাকে নয় ছয় বুঝিয়ে বাপের পেনশন সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে নেয়।একদিন সুযোগ বুঝে ব্যাংক থেকে সোলায়মান টাকাগুলো উত্তোলন করে ফেলেন।সেই উত্তেলনকৃত টাকা তিনি অারেক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা রাখেন। একদিন তার ছোটভাই রহমান বলে ওঠে,ভাইয়া, অামার সেমিষ্টার ফি লাগবে অাব্বার ওখান থেকে কিছু টাকা দাও। -সোলায়মান বলে ওঠে, ‘এত বড় হইছস, নিজে কামাই করে খেতে পারস না’। -অামিতো এখনো পড়ছি ভাইয়া,এখনো তো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারিনি।চাকরি কে দেবে? -ক্যান, বিভিন্ন জায়গায় ইন্টার পাশ করা লোক তে নিচ্ছে,সোলায়মান জোর গলায় বলল। রহমান একবার সোলায়মানের মুখের দিকে তাকায় অারেকবার নিচের দিকে তাকায় কি বলবে ভেবে পায়না।তারপর দাঁত মুখ শক্ত করে বলে ফেলে,’অামি এখন চাকরি করলে পড়ালেখার ক্ষতি হইব। -বাপ ছিল বাপে খাওয়াইছে বসায় বসায়, অামি পারুম না,তুই পারলে গার্মেন্টসে ঢুকে যা.. -কি বলছেন ভাই,গার্মেন্টসে কি দুই চার ঘন্টার চাকরি নাকি!দশ বারো ঘন্টা কাজ করতে হয়।এই কথা বলতে বলতে রহমান চোখ মুছে পকেট থেকে রুমাল বের করে।অার বিড় বিড় করে বলে, অাব্বা থাকলে অাজকে অার কারো কাছে হাত পাততে হতোনা। -কাজ করলে করবি কষ্ট করে বাঁচ। -অাপনে পেনশনের টাকা গুলো তুলছেন না?সেগুলো কি করছেন? রহমান এবার জোর গলায় বলে ওঠল। এই শোনার জন্য সোলায়মান প্রস্তুত ছিলনা।থতমত করে বলে ওঠল ওরে শোন ছোট ভাই, ওগুলোতো অামি ব্যাংকে জমা রাখছি,সময়মত পাবি। -অামার তো এখন দরকার,পড়াটা শেষ করতে পারলে নিশ্চয়ই একটা ভালো চাকরি জোগাড় করে নিতে পারব। -তুই টিউশনি করতে পারস,স্কুল কলেজের পোলাপান পড়াই টাকা ইনকাম করতে পারস না। -হ,তাই করতে হবে।অাপনে যেহেতু বাপের পেনশনের টাকাগুলো দিতাছেন না,অামাকে তাই জীবনের সংগ্রামে নামতে হইব। রহমান রুম থেকে বেরিয়ে যায়।অন্যরুমে গিয়ে মাকে বিষয়টা বুঝালে তার মা বলে, বাপরে অামি তো বড় পোলারে কিছু কইতে পারিনা,কোন সময় কি করে বসে ঠিক নাই। -ক্যান তোমার নিজের পোলা নিজে শাসন করতে পারনা! – পোলা বড় হইলে অার নিজের পোলা থাকেনারে, এই বলে তিনি চোখ মুছতে লাগলেন। কিছুদিন পর শোনা যায়, সোলায়মান শহরে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে।ভাড়া বাসা ছেড়ে বউ অার দুই বছরের মেয়ে তানিয়াকে নিয়ে অালাদা বাসায় ওঠে মা অার ছোট ভাইকে ছেড়ে।এদিকে রহমান অার তার মা বুঝতে পারে বাপের পেনশনের টাকাগুলো দিয়েই সোলায়মান ফ্ল্যাটটা কিনেছে।সবকিছু বুঝে ওঠার পরও রহমান প্রতিবাদ করতে পারেনা। একদিন রহমান তার মাকে বলল,অাম্মা তুমি ক্যান তোমার বড় পোলারে পেটে ধরছিলা? – অামি কি জানতাম সে বড় হইয়া এমন বেয়াড়া হয়া যাবে! বড় ছেলে সোলায়মানকে অনেক অাদর যত্নে বড় করেছে তার মা -বাবা।কে জানত বড় হয়ে সে মা বাবাকে কষ্ট দিবে।বাপের পেনশনের সব টাকা একা নিজেই ভোগ করবে।বিয়ের পর বউ সন্তান নিয়ে অালাদা ফ্ল্যাটে ওঠে।। রহমান কয়েক মাস পর একদিন সোলায়মানের বাসায় যায়।দরজায় টোকা দিতেই, স্লামালাইকুম ভাবি,কেমন অাছেন? – ভালো,তুমি কেন এসছ হঠাৎ?সোলায়মানের বউ দৃঢ় গলায় বলল। – ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। -তোমার ভাইতো এই সময়ে বাসায় থাকার কথা না!তুমি জানোনা! – হুম বুঝছি,তবে একটা খবর জানানোর জন্য অাসছি। – কি? -অামি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে জয়েন করেছি।বেতন এক লাখের কম হবেনা।ভাইকে জানায় দিয়েন। এই কথা শোনার জন্য সোলায়মানের বউ তামান্না প্রস্তুত ছিলনা।সে ভাবল, তার জামাইতো তার অর্ধেক টাকাও বেতন পাননা। পাঁচ বছর পর রহমানের বাড়ি গাড়ি ফ্ল্যাট সব হয়ে যায়।সোলায়মান যে কোম্পানীতে চাকরি করে সে কোম্পানীর এমডির মেয়েকে বিয়ে করে রহমান।রহমানের শ্বশুর জয়নাল উদ্দিন মস্ত বড় কোম্পানীর এমডি।কিছুদিন পরই কোম্পানীর সকল দায়দায়িত্ব মেয়ের জামাইর কাছে বুঝিয়ে দিবেন অাজগর সাহেব।অার সে কোম্পানীর সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে থাকে সোলায়মান।অার সে দিনের পর দিন ভাবতে থাকে চাকরিটা করবে না ছেড়ে দিবে!

 

লেখকের সম্পর্কেঃ 

নামঃ রেজা তানভীর

পেশাঃ ছাত্র

বাসাঃ চট্টগ্রাম

 

Use Facebook to Comment on this Post