২০ শে মে, ২০১৯ ছিলো রমজান মাসের ১৪ তম দিন। সেদিন সেহেরী খেয়ে বাবার সাথে প্রাইভেট কার যোগে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে পৌঁছুলাম। বিমানবন্দরে পৌঁছেই বোর্ডিং পাস, ইমিগ্রেশন ও চেকিং পর্ব শেষে যাত্রী রুমে অপেক্ষা করছি ফ্লাইটের জন্য, বিমানে করে অামরা প্রথমে যাবো ঢাকা, তারপর ঢাকা টু জেদ্দা। বিমান কর্তৃপক্ষ ফ্লাইট একটু পিছিয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের এই ফ্লাইটটি ছিলো সকাল ১১ টায়, কিন্তু অামাদেরকে নিয়ে উঠালো দুপুর ২ টারও কিছু পরে। অাধাঘন্টার মধ্যে অামরা ঢাকা শাহজালাল অান্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম। বিমানবন্দরের নামাজ কক্ষে নামাজ পড়ে অামরা ওমরাহ’র নিয়ত করলাম। অামাদের ঢাকা টু জেদ্দা ফ্লাইট সন্ধ্যা ৭ টা ৩০ মিনিটে। এর মধ্যেই ইফতারির সময় হয়ে এলো। বিমানবন্দরে অামাদের জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করা হলো। ইফতার শেষ করতে করতে ফ্লাইটের সময় হয়ে গেল। মাগরিবের নামাজ শেষে বিমানে উঠলাম। প্রায় ৭ ঘন্টা বিমানে থাকতে হবে, বিমানে উঠার কিছুক্ষণ পর দিলাম একটা ঘুম। ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি বিমানবালারা অামাদের জন্য রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, তারা বিরানি মাংস ও সবজি পরিবেশন করলো। ২১ শে মে, ২০১৯ রাত দুইটার দিকে অামরা জেদ্দা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছুলাম। সেখানে ইমিগ্রেশন পর্ব শেষ করে লাগেজ সংগ্রহ করে যখন গেইট দিয়ে বেরুচ্ছিলাম তখন কিছু তরুণ অামাদেরকে তাদের সিম কিনতে অনুরোধ করল। কোনো কোনো সিম ফ্রিতেও দিচ্ছিলো। অামরা পাসপার্ট দেখিয়ে একটা ফ্রি সিম সংগ্রহ করলাম। সিমের নাম মোবিলি। সিম কোম্পানীগুলো ফ্রিতে সিম দিলেও সেগুলোর মেয়াদ থাকবে ৪ দিন পর্যন্ত। ৪ দিন পর নিজে টাকা রিচার্জ করতে হবে। সিম কেনা শেষ হলে অামরা অামাদের কাফেলার গাইডার সাদেক ভাইকে অনুসরণ করতে লাগলাম৷ সাদেক ভাইয়ের ব্যাপারে একটু বলা যাক, তিনি একটি ট্রাভেল কোম্পানীর হজ্জ ও ওমরাহ’র জন্য যেসব লোক সৌদি অারব অাসেন তাদেরকে দেখাশোনা, পরিচালনা ও গাইডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে সাধারণত মোয়াল্লেম বলা হয়। তিনি একটি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে চাকরিও করেছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অধ্যাপনা ছেড়ে এ পেশায় অাসলেন কেনো? তিনি কিছু বলেন না, চুপ থাকেন। হয়তো এই পেশায় তিনি পছন্দ করেছেন। বেশ সরল ও অাল্লাহভীরু মানুষ। প্রায় ২০ দিন পর্যন্ত তিনি ওমরাহ কাফেলায় অাসা হাজী ভাই বোনদের খাওয়া দাওয়া, হোটেলে থাকা, বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখাতে সাহায্য করেছেন। কাফেলায় প্রায় ৫০ জন মানুষ ছিলেন। তাদের সবাইকে নিয়ে তিনি জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে বাস যোগে রওনা হলেন মক্কার উদ্দেশ্যে। তখন গভীর রাত। ভোরও উঁকি দিচ্ছে। রাতে বিমানে তেমন ঘুমাতে পারিনি বলে বাসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। মক্কার কাছাকাছি যখন অাসলাম তখন ঘুম ভাঙ্গল। দেখতে পেলাম পৃথিবীর প্রাচীন নগরী মক্কার রাস্তাঘাট, দালানকোঠা ও পাথরের পাহাড়। তারপর অামাদের জন্য যে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সে হোটেলের সামনে এসে বাস দাড়ালো৷ গাড়ি থেকে ব্যাগ লাগেজ নামিয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লাম। হোটেলটির অবস্থান মক্কা নগরীর কাবা শরীফ থেকে একটু অদূরে ইব্রাহীম খলিল স্ট্রীটের শেখায়েত অাল খলিল হোটেলে অামরা উঠলাম। হোটেলের রিসিপশানে অামরা অপেক্ষা করছি। অামাদের কাফেলার যিনি গাইডার মানে মোয়াল্লেম রুম বরাদ্দ করছেন, কে কোন রুমে থাকবে। হোটেলের কোনো কোনো রুমে ৪ জন বা ৭ জন করে থাকার ব্যবস্থা অাছে। শেখায়েত অাল খলিল হোটেলের মালিক ছিলো বাংলাদেশী এবং চট্টগ্রামের ছেলে। হোটেলের কয়েকজন কর্মচারীও বাঙ্গালী। সুতরাং অামাদের কোনো অসুবিধা হলোনা। হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে অামরা মোয়াল্লেম সাদেক ভাইকে অনুসরণ করলাম। তিনি অামাদেরকে নিয়ে যাবেন কাবা শরীফে। অামরা অাজ ওমরাহ পালন করব। সেদিন ছিলো ২১ শে মে ২০১৯। ইব্রাহীম খলিল স্ট্রীটের রাস্তা দিয়ে অামরা প্রায় ৫০ জন মানুষ হেঁটে যাচ্ছি পবিত্র কাবা শরীফের দিকে। পথে যেতে যেতে দেখলাম রাস্তায় কবুতরদের বিচরণ। রাস্তার একটা বড় অংশজুড়ে কবুতররা পায়চারি করছে, সেখানে তারা খায়দায়, ওড়াওড়ি করে। কেউ কেউ কবুতরদের গম, চালসহ বিভিন্ন ধরণের খাদ্য খেতে দেয়। সেটাকে বাঙ্গালীরা কবুতর চত্বর বলে। অারবরা হয়তো কবুতর চত্বরকে অন্য নামে ডাকে। প্রায় অাধা কিলোমিটার জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ওড়াওড়ি ও খাওয়া দাওয়া করছে কবুতরগুলো। কেউ কেউ কবুতরদের ছবি তুলছে। কবুতর চত্বর পেরিয়ে অামরা মসজিদুল হেরেমের কাছাকাছি চলে এসেছি। এদিকে কাফেলার হাজীরা তাদের স্ত্রী, মা অথবা বোনকে নিয়ে এসেছে। সবাই লাব্বাইক অাল্লাহুম্মা লাব্বাইকা লাব্বাইকা লা শারিকালাকা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়ান্নেহ মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারিকালাক পড়তে পড়তে কাবা শরীফের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। হোটেল থেকে ১০ মিনিটের পায়ে হাঁটা দূরত্বে কাবা শরীফ। ১০ মিনিটের মধ্যেই অামরা কাবা শরীফে পৌঁছে গেলাম। ছোটবেলা থেকে টেলিভিশনে বহুবার দেখেছি কাবা শরীফ কিন্তু বাস্তবে এই প্রথম। এটা অামার জন্য সৌভাগ্য। অামরা সবাই কাবা শরীফ তাওয়াফ করলাম। সৌদি সময় তখন সকাল ১০ টা হবে। মাথার উপর রোদের প্রচন্ড তাপ। দেখলাম এই গরমেও তাওয়াফ করছে বিভিন্ন দেশ থেকে অাগত মুসলমানরা। অামরা বাংলাদেশীরা যেটির দিকে মুখ ফিরে নামাজ পড়ি, যেদিকে পা রেখে ঘুমাইনা সেটার সামনে চলে অাসছি। অামার কাছে বিশ্বাসই হচ্ছিলোনা যে অামি কাবার সামনে চলে অাসছি। কাবা শরীফ কালো সিল্কের উপর স্বর্নখচিত ক্যালিগ্রাফি করা কাপড়ের গিলাফে অাবৃত। কাপড়ি কিসওয়াহ নামে পরিচিত, যা প্রতিবছর পরিবর্তন হয় এবং কাপড়ের উপর কালেমা শাহাদাত সুতা দিয়ে লেখা হয়। জেনেছি, কাবা ঘরের কোরঅানের বাণী স্বর্ণ দিয়ে এমব্রোয়ডারি করা হয়। কাবা শরীফে ৭ বার ঘুরতে হয়। এটাকে তাওয়াফ বলা হয়। ৭ বার চক্কর দিলে এক তাওয়াফ পূর্ণ হয়। কাবা শরীফে হাজরে অাসওয়াদ নামে একটি কালো পাথর অাছে, সেখানে চুমু দেয়া সুন্নত। যারা তাওয়াফ করেন তারা এই জায়গায় চুমু দেয়ার চেষ্টা করেন, প্রচন্ড ভিড়ের কারণে সেখানে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকেই চুমু দিতে পারেনা, অামিও পারিনি। কাবা চত্বরে অাছে মাকামে ইবরাহীম, কাঁচ দিয়ে ঘেরা দিয়ে এখানে সংরক্ষণ করা অাছে হযরত ইবরাহীম (অাঃ) এর পায়ের ছাপ। অনেকেই এটি স্পর্শ করেন এবং ইবরাহীম (অাঃ) এর পায়ের ছাপ দেখে থাকেন। কাবার অারো যে অংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হচ্ছে রুকুনে ইয়ামেনি, রুকুনে শামি, রুকুনে ইরাকি, হাতিম। অামি কাবা শরীফ তাওয়াফ করার প্রথম দিনেই কাবা শরীফ স্পর্শ করতে পেরেছি। ১০/১১ টার দিক মানুষের চাপ একটু কম থাকে বলেই পেরেছি, কাবা শরীফ ৭ বার চক্কর শেষে অামরা সাফা মারওয়া পাহাড় চক্কর দিলাম। ইবরাহীম (অাঃ) এর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈল (অাঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত এই সাফ মারওয়া পাহাড়ে অসংখ্য লোক হাঁটছে এবং দৌড়ছে। সবুজ বাতি যেখানে জ্বলে সে জায়গায় দৌড়াতে হয়। অামি এতদিন জেনে এসেছি সাফা মারওয়া কোনো পাহাড়ের অাদলেই হবে, তবে এখানে এসে দেখলাম, ইট পাথর সিমেন্ট দিয়ে হাঁটার জন্য সুবিধা করে দেয়া হয়েছে। খুবই মনোরম পরিবেশ, উপরে অাছে ফ্যান, সেগুলো ঘুরছে। অাগে পাহাড়ের অাকৃতিতে ছিলো সাফা মারওয়া , এখন এটিকে দৃষ্টিনন্দন অাকারে রূপদান করা হয়েছে। সাফা মারওয়া চক্কর দেয়া শেষে অামরা সেলুনে গেলাম৷ সেটি বাঙ্গালি সেলুন ছিলো৷ ওই লোকের বাড়ি চট্টগ্রামে। ওমরাহ পূর্ন করার একটি পর্ব হচ্ছে চুল কাটাতে হয়। অামরা দরদাম না করেই চুল কাটালাম। তো, চুল কাটা শেষে অামার বাবার কাছে তারা ২৫ রিয়াল চাইলো, ২৫ রিয়াল মানে বাংলাদেশী টাকায় ৫৫০ টাকা, তবে দরদাম করে অামরা ২০ রিয়াল দিয়েছি। পরে হোটেলে এসে অন্যান্য হাজী ভাইদের থেকে শুনেছি ৫ রিয়াল করে নেয় সাধারণত চুল কাটায়। অার অামরা দিয়েছি ১০ রিয়াল করে। বুঝলাম, অামাদের ঠকানো হয়েছে। যে ঠকিয়ছে সে-ও বাঙ্গালী। অাচ্ছা যাই হোক।

শুনেছি, হজ্জ ও ওমরাহ মৌসুমে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ এবং কখনো কখনো তিনগুনও হয়ে যায়, এবং এদিনই সাফা মারওয়া চক্কর শেষ করার পরই অামি অামার স্যান্ডেল হারিয়ে ফেললাম। কাবা শরীফের প্রবেশ পথ অনেকগুলো। কোনো একটা গেইটে স্যন্ডেল রাখছি পুলিশ সম্ভবত সেটা সরায়ে দিছে এবং এর মধ্যেই অামি অামার স্যান্ডেল হারিয়ে ফেললাম, অার হাড়ে হাড়ে টের পেলাম স্যান্ডেল ছাড়া মক্কার রাস্তায় হাঁটা কতটা কষ্টকর। দুই মিনিটেরও কম সময় অামি যখন স্যান্ডেল ছাড়া ছিলাম মনে হচ্ছিল পা পুড়ে যাচ্ছিল। অারেকটু হলে অামার পা গরমে জ্বলে যেত। এমনকি প্রথম দিন কাফেলার সবাই যখন তাওয়াফ করছিলো সেদিন অামি অার বাবা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি অন্যদের থেকে। লক্ষ লক্ষ মানুষ কে কাকে খুঁজে পায়। অামাদের হোটেল হচ্ছে ইব্রাহীম খলিল স্ট্রীটে কিন্তু অামরা পথ হারিয়ে ফেলে অন্য একটা স্ট্রীটে ঢুকে পড়েছি। জানতে পেরেছি, মক্কা শহরে ঢুকার পথই নাকি ৫০ টা, ভাবা যায়!

মক্কায় অবস্থানকালে রমজানে অামরা অামরা ইফতার করেছি কখনো হেরেম শরীফে বা কখনো হোটেলে৷ হোটেলের বাঙ্গালী ভাইদের সাথে। ১৫ থেকে ২০ রমজান পর্যন্ত অামরা মক্কায় ছিলাম।

মক্কার রাস্তাঘাট বেশ প্রশস্ত, রাস্তার ধারে ধারে সড়কবাতি, প্রচন্ড গরম লাগলে বাতিগুলোর সাথে এমনভাবে যন্ত্র সংযুক্ত থাকে যেখানে উপর থেকে রাস্তায় চলাচলরত লোকজনের উপর পানি ছিটানো হয় প্রচন্ড গরম থেকে বাঁচানোর জন্য। সৌদি অারবের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রী থেকে ৫০ ডিগ্রী বা তার চাইতেও বেশি থাকে। সানগ্লাস ছাড়া বের হওয়াটা খুবই কষ্টকর। যারা রোদে চলাচল করতে অভ্যস্ত তারা হয়তো পারবে, কিন্তু অামি দিনে বের হলে সামান্য সময়ের জন্যও সানগ্লাস ছাড়া থাকতে পারিনি, অামার মনে হয়েছে অারো সূর্য নিরোধক কালো চশমা দেশ থেকে অানলে ভালো হত। অবশ্য ছাতাও খুবই প্রয়োজন রোদ থেকে মাথা ও শরীর বাঁচাতে। অামরা ভেবে পাইনা, বাংলাদেশ থেকে সৌদি অারবে যারা কাজ করতে অাসে তারা কিভাবে এই গরমের মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। সৌদি অারবে অবস্থানকালে এই রোদটাই অামাকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।

মক্কায় অনেক বাঙ্গালী হোটেল অাছে যেগুলোর মালিকই স্বয়ং বাংলাদেশী, অনেক দোকানপাট যেমন- অাতর, তসবীহ, জায়নামাজ, হিজাব, স্কার্ফ, খেজুরের দোকান অাছে যেগুলোর বেশিরভাগই বাঙ্গালী। অামার মনে হয় পুরো মক্কা শহরের অলিগলিতে বাংলাদেশী লোকজন দেখতে পাওয়া যায়, যাদের বাড়ি কোথাও ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, ঢাকা, যশোর, খুলনা সহ বিভিন্ন জেলার লোকজন। অামার কাছে যেটা মনে হয়েছে অরিজিনাল অারবের লোক খুবই কমই দোকানপাট করে, কেউ পাকিস্থানী, কেউ ইন্দোনেশিয়ার, কেউ ভারতের তামিলনাড়ু বা কাশ্মিমের লোক এখানে এসে জীবন জীবিকার সন্ধান করছেন। খাওয়া দাওয়ার জন্য অসংখ্য বাঙ্গালী হোটেল অাছে। একটা বড় রুটি যেটা অামাদের ঘরে বানানো তিনটা ছোট রুটির সমান, এসব রুটি ১ রিয়ালে কিনতে পাওয়া যায়। ১ টা রুটি অার এক বাটি সবজি খেলেই পেট ভরে যায়।

মক্কায় অবস্থান কালে দেখতে পেয়েছি, কাবা ঘর থেকে একটু দূরে নবীজী (সঃ) এর জন্মস্থান, মা অামেনার এই ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন বলে অনেক ঐতিহাসিকগণ মত দিয়েছেন, তবে এখানের দেয়ালে লেখা অাছে, এই জায়গাটিতেই যে নবীজী (সঃ) জন্ম নিয়েছেন তার পুরোপুরি সঠিক কোনো দলিল নেই, এখানে কোনো জেয়ারত করা যাবেনা। তবে এখন এই ঘরটি পাকা করা হয়েছে এবং পাঠাগারে রূপদান করা হয়েছে। ঠিক এই পাঠাগারটির বিপরীতে একটু সামনে এগোলেই যে জায়গাটি অাছে সেটি টয়লেট, জানা যায়, অাবু জেহেলের বাড়ি ছিলো এটি, অাবু জেহেলের এই বাড়িটিকে বর্তমানে টয়লেটে পরিণত করা হয়েছে।

কাবা ঘরের অাশপাশে জমজমের অনেকগুলো লাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেগুলো থেকে মানুষ সার্বক্ষণিকই পানি পান করে, বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পানি সংগ্রহ করে কিংবা কোন কোনো নলের সামনে মানুষ গোসল করতে দেখা গেছে। বরকতময় এই জমজমের পানির যে গুণ সেটা বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখেনা।

মক্কায় তাওয়াফ করার সময় নারী পুরুষ একসাথেই করে, নামাজও পড়ে একসাথে, নারীদের জন্য অালাদাভাবে কোথাও কোথাও ব্যবস্থা অাছে অথবা পুরুষ সামনে মহিলা পিছনে এভাবেও নামাজ পড়ে। রমজানে এতো বেশি মানুষের ভিড় থাকে যে, অাশপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে মানুষ এক ইমামের পিছনে জামাতে নামাজ অাদায় করে।অাজান হয়ে গেলে যে যেখানে অাছে সেখানেই জায়নামাজ বিছিয়ে দেয়, সেটা হতে পারে রাস্তায়, হোটেলের বা দোকানের সামনে, অাজান হয়ে গেলে হেরেম শরীফের ভিতরে ঢুকা সো টাফ। অতএব, পুরো রাস্তা জুড়ে মানুষ অার মানুষ। রাস্তা বন্ধ, কোনো গাড়ি চলেনা, সবাই যার যার কাজকর্ম ফেলে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়৷ মক্কায় অামরা দেখেছি, হজ্জের সময় যে জায়গা থেকে ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করেন ওই জায়গা, মিনা যেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করা হয়, অার দেখেছি অারাফাতের মাঠের মতো বিশাল ময়দান।

মক্কা থেকে মদীনায় অামরা যাই ২৫ শে মে, মক্কা থেকে মদীনা যেতে যেতে গাড়ী থেকে অামরা দেখি এই অঞ্চলের বিশাল বিশাল মরুভূমি, দিগন্তজুড়ে চোখ চলে যায় কোনো কিনারা দেখা যায়না। মাইলের পর মাইল ধূঁ ধূ মরুভূমি, কোনো গাছপালা নেই। প্রচন্ড রোদ, তবে মরুর বুকে দেখেছি উট, উটগুলো খুব স্বাচ্ছ্যন্দের সাথে মরুর বুকে বিচরণ করছে, তাইতো উটকে মরুর জাহাজ বলা হয়ে থাকে।

মদীনার পথে বাস চলছে অবিরাম গতিতে। বাংলাদেশে সাধারণত ডানদিকে ড্রাইভারের অাসন থাকে অার সৌদিতে দেখলাম বামদিকে এবং বাংলাদেশে বামদিকে গাড়ি চালানো হয় অার সৌদিতে ডানদিকে। বিশাল বিশাল রাস্তা, বিশাল বিশাল পাহাড়, অামরা হেরা পর্বতের গুহা দেখেছি যেখানে পবিত্র কোরঅান সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছিলো।

অামাদের দেশে যেখানে পাহাড় মাটি দিয়ে তৈরী, পাহাড়ে থাকে গাছ বন, সেখানে দেখলামপাহাড়ে তো গাছ নেই-ই উল্টো পাহাড়গুলোতে বিশাল বিশাল পাথর, কখনো পাহাড়ের ভিতর দিয়ে চলে গেছে সুরম্য রাস্তা, সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রাস্তা তৈরী করা হয়েছে।এভাবে সারাপথ মরুভূমি দেখতে দেখতে প্রায় ৫ ঘন্টার জার্নি শেষে অামরা ওইদিন বিকাল তিনটার দিকে মদীনায় এসে পৌঁছুলাম। এখানে অামরা ৪ জন ছিলাম এক রুমে, কাফেলা থেকে বরাদ্দ দেয়া রুমে, ৪ জনের মধ্যে ছিলাম অামি, অামার বাবা, একজন সাবেক রেজিষ্ট্রার কর্মকর্তা এবং একজন ব্যাংকার। প্রায় ১০ দিন যাবত অামরা এক রুমে ছিলাম ।

মদীনাতে যে হোটেলে উঠি সেটা একেবারে মসজিদে নববী থেকে ৫ মিনিট পায়ে হাঁটা দূরত্বের। নববীর ৭ নং গেইট দিয়ে সামনে এগোলে সালাম স্ট্রীট রোডের মানাজিল অার হারাম হোটেলে অামরা ছিলাম। মদীনার এই হোটেলের মান মক্কার হোটেলের চেয়ে তুলনামূলক ভালো ছিলো। এই হোটেলেও বেশ কয়েকজন বাঙ্গালী ছেলে কাজ করে, তাদের সাথে বেশ কথাবার্তা হলো৷

মসজিদে নববীতে প্রথম যেদিন ঢুকলাম সেদিনই অামরা রওজা মোবারক জেয়ারত করলাম, খুব কাছ থেকে রওজা মোবারক জেয়ারত করার সুযোগ হয়েছে, এখানের মাটিতে শুয়ে অাছেন বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত রাসূলে পাক (সঃ)। তার বামপাশে একটি একটি কবর খালি রাখা হয়েছে যেখানে কেয়ামতের অাগে ঈসা (অাঃ) অাসবেন এবং তাঁকে এখানে সমাহিত করা হবে। মুহাম্মদ সঃ এর রওজার পাশে অারো দুটো কবর অাছে, সেগুলো হচ্ছে হযরত অাবুবকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর। নবী করিম সঃ যে কক্ষে ইন্তেকাল করেছেন সে কক্ষেই তিনি তাঁকে সমাহিত করা হয়। রওজার সামনে মানুষের প্রচুর ভিড়, নির্দিষ্ট সময়ে পালাক্রমে এখানে পুরুষ ও নারীদের জেয়ারত করার সুযোগ করে দেয়া হয়।

মসজিদে নববীর অারেক পূণ্যস্থান হলো রিয়াজুল জান্নাত, হাদীস মারফত জেনেছি, এখানে দুইরাকাত নামাজ পড়তে হয়। রাসূল পাক সঃ বলেছেন, রিয়াজুল জান্নাত হচ্ছে সে জায়গা যেটি হবে জান্নাতের টুকরো। নবীজী সঃ এখানে নামাজ ও খুতবা পাঠ করতেন। সাধারণত জোহরের নামাজের পর রিয়াজুল জান্নাতের গেইট খুলে দেয়া হয়। এই জায়গায় অামি দুইদিন নামাজ পড়েছি, প্রথমদিন চার রাকাত এবং দ্বিতীয় দিন দুই রাকাত। পুলিশ একজনকে এখানে বেশিক্ষণ থাকতে দেয়না অন্যদের জায়গা করে দিতে হবে বিধায়। এখানেও লোকজনের খুব ভিড়। কারণ এক গ্রুপ শেষ করার পর অারেক গ্রুপকে সুযোগ করে দিতে হবে। দুই রাকাত নামাজ শেষ হলে অনেকটা ধরেই বের করে দেয় পুলিশ।

মসজিদে নববীর অারেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো জান্নাতুল বাকী। এখানে শুয়ে অাছেন হযরত ওসমান রাঃ সহ প্রায় ১০ হাজার সাহাবী। প্রতিনিয়তই এই কবর সম্প্রসারিত হচ্ছে। জান্নাতুল বাকীকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবরস্থান বলা হয়। অারেকটা ব্যাপার হচ্ছে মক্কার মত মদীনাতেও এখানে প্রতি ওয়াক্তে জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক ফরয নামাজের পর এই জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এই সকল জানাযায় সৌদি অারবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোনো লোক মারা গেলে এখানে অানা হয়, এর কারণ হচ্ছে এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে নামাজ পড়ে। এত ইমানদার লোক মক্কা মদীনা ছাড়া কোথাও পাওয়া যাবেনা। তাই এখানে জানাযা দেয়া হয়। মক্কায় নারী পুরুষ অনেকটা একসাথে নামাজ পড়লেও মদীনায় পুরষ ও নারীর জন্য অালাদা অালাদা নামাজের ব্যবস্থা অাছে।

মসজিদে নববীর ঠিক বিপরীত পাশে একটি কুরঅানের মিউজিয়াম অাছে যেখানে সংরক্ষিত করা অাছে প্রথম অাল কোরঅানের হস্তলিপি। যেটি হযরত ওসমান (রাঃ) নিজ হাতে লিখেছেন। অাছে শত শত বছরের পুরনো কুরঅানের পান্ডুলিপিগুলো যেগুলো ঐতিহাসিক ইসলামী মনীষীরা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ওই মিউজিয়ামটিতে দেখতে পেয়েছি চমৎকার কিছু ছবি ও ভিডিও ডকুমেন্টারি।

অামাদের দেশে তারাবীর নামাজ দ্রুতগতিতে পড়ানো হলেও সৌদিতে ধীরে ধীরে মধুর সুরে পড়ানো হয়৷

মক্কার মতো মদীনার মসজিদে নববীতেও জমজমের পানির লাইন অানা হয়েছে। মদীনায়ও প্রচুর বাঙ্গালী লোকজন অাছে। বিশেষ করে অনেকগুলো বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট অাছে, বাঙ্গালী খাবার দাবার পাওয়া যায়। কম দামে পাওয়া যায় জায়নামাজ, স্কার্ফ, হিযাব, পাঞ্জাবী, জোব্বা, অাতর, তসবীহ, খেজুর ও চকলেট। এই দোকানগুলোর অনেক মালিকই বাংলাদেশী। যেখানে গিয়ে বাংলায় কথা বলে দরদাম করে নিতে কোনো সমস্যা হবেনা। অারবের লোকেরা অারবী ছাড়া ইংরেজী বলতে পারেনা, তারা বলতে বা শিখতেও অাগ্রহী নয়। অরিজিনাল সৌদি অারবের লোক দোকানপাট করে এরকম খুঁজেই পাওয়া যাবেনা মনে হয়। গুগল করে জানলাম, মাত্র তিনকোটি জনসংখ্যার দেশ সৌদি। যার বেশিরভাগই ধনী।

দেখতে দেখতে রমজান শেষ হয়ে গেল। ৪ ই জুন, ২০১৯ অামরা ঈদের নামাজ পড়লাম মসজিদে নববীতে। অামরা অাগেই জেনেছি, ফযরের পর পরই এখানে ঈদের নামাজ হয় যায়, তাই অাগে যেতে হবে, না হলে জায়গা পাওয়া যাবেনা, তাই রাত ৩ টায় গোসল করে নববীতে গিয়ে ফযরের নামাজ জামাতে অাদায় করলাম। ফযরের নামাজের পর প্রায় দেড় ঘন্টার মত অপেক্ষা করতে হয়েছে ঈদের নামাজের জন্য। নামাজ পড়েই তাই অামরা বসে রইলাম মসজিদে। উঠলাম না জায়গা থেকে, কারণ উঠলে অাবার সমস্যা, যে পরিমাণ লোকজন তাতে জায়গা যদি ছেড়ে দেই পরে অাবার অাসন পেতে ভীষণ কষ্ট হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান নারী পুরুষ নামাজ ও জেয়ারত করতে এসেছে। সূর্য উঠার পর সকাল ৬ টায় ইমাম সাহেব নামাজ পড়ালেন। তারপর খুুতবা শোনালেন। ঈদের নামাজ শেষ হলে পরিচিত যে কয়জন অাছে তাদের সাথে হোটেলে চলে অাসলাম। হোটেল কক্ষে গিয়ে দেখি কাফেলা থেকে অামাদের জন্য সেমাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের দিন সেমাই খেয়ে বেশ ভালো লাগলো। এরপর মক্কা গেলাম অাবার। সেখানে ৫ দিন ছিলাম৷ কাবা শরীফ তাওয়াফ ও জেয়ারত করলাম৷ এভাবে দেখতে দেখতে ১১ ই জুন প্রায় ২০ দিনের সফর শেষে অামরা দেশের পথে রওনা হলাম এবং নিরাপদে দেশে পৌঁছে এলাম। স্মৃতির পাতায় যোগ হলো একটি ঐতিহাসিক ভ্রমণ। শুকরিয়া।

Use Facebook to Comment on this Post