সফলতার অজানা অধ্যায় | মোঃ ইকবাল ফারুক

ইক্করা (পড়)! মহা বিশ্বের মহান স্রষ্টা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতার মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোত্তম মানুষের কাছে সর্বপ্রথম এই শব্দটিই অবতীর্ণ করেন। এরপর এই পৃথিবীতে শুরু হয় মানব সভ্যতার এক প্রোজ্জ্বল পরিক্রমা।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে নিজেকে সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর লেখা-পড়ার গুণগত পরিবর্তন। গবেষণা মতে একজন মানুষ তার মস্তিষ্কের শতকরা পাঁচ থেকে সাত ভাগ ব্যবহার করতে পারে। বড় বড় বিজ্ঞানীদের বেলায় সেটা পনের থেকে আঠার ভাগ। অনেক শিক্ষার্থীই পড়াশোনায় সময় দেওয়ার পরও পড়া মনে রাখতে পারে না। তাই পড়া মনে রাখার কিছু কৌশল ও পদ্ধতি দেয়া হলো। আত্মবিশ্বাস আত্মবিশ্বাস যে কোনো কাজে সফল হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত। মনকে বোঝাতে হবে, পড়া শোনা অনেক সহজ বিষয়-আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে। তাহলে অনেক কঠিন পড়াটাও সহজ মনে হবে।

কোনো বিষয়ে ভয় ঢুকে গেলে সেটা মনে রাখা বেশ কঠিন। কি ওয়ার্ড যে কোনো বিষয়ের কঠিন অংশগুলো ছন্দের আকারে খুব সহজে মনে রাখা যায়। যেমন- রংধনুর সাত রং মনে রাখার সহজ কৌশল হলো ‘বেনীআসহকলা’ শব্দটি মনে রাখা। প্রতিটি রঙের প্রথম অক্ষর রয়েছে শব্দটিতে। এমনিভাবে ত্রিকোণমিতির সূত্র মনে রাখতে ‘সাগরে লবণ আছে’ ‘কবরে ভয় আছে’ ‘টেমসে লাশ ভাসে’ ছড়াটি মনে রাখতে হবে। এর অর্থ দাড়ায়, ঝরহ= লম্বা/ অতিভূজ (সাগরে লবণ আছে), পড়ং= ভূমি/ অতিভূজ (কবরে ভয় আছে), ঞধহ = লম্ব/ ভূমি (টেমসে লাশ ভাসে)। উচ্চঃস্বরে পড়া পড়া মুখস্থ করার সময় উচ্চঃস্বরে পড়তে হবে। এই পদ্ধতিতে কথাগুলো কানে প্রতিফলিত হওয়ার কারণে সহজে আয়ত্ব করা যায়। শব্দহীনভাবে পড়া লেখা করলে এক সময় পড়ার গতি কমে গিয়ে লেখার আগ্রহ হারিয়ে যায়। আর আগ্রহ না থাকলে পড়া শেখার কিছুক্ষণ পরই তা মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিজের পড়া নিজের মতো ক্লাসে মনোযোগী হতে হবে। স্যারদের লেকচার ও পাঠ্য বইয়ের সাহায্য নিয়ে নিজে নিজে নোট করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

নিজের পড়া নিজের মতো করে পড়তে হবে। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করা ক্লাসের প্রতিদিনের পড়া পরবর্তী দিন ক্লাসে যাবার পূর্বেই শেষ করতে হবে। কখনইও আজকের পড়া আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা যাবে না। কারণ, আগামীকাল তোমার সামনে আসবে নতুন পড়া ও নতুন চ্যালেঞ্জ। কন্সেপ্ট ট্রি পড়া মনে রাখার ভালো কৌশল হলো কন্সেপ্ট ট্রি। এ পদ্ধতিতে কোনো একটি বিষয়ে শেখার আগে পুরো অধ্যায়টি সাতটি অংশে ভাগ করে প্রতিটি অংশের জন্য এক লাইনে একটি করে সারমর্ম লিখতে হবে। তারপর খাতায় একটি গাছ এঁকে সাতটি সারমর্মকে গাছের একেকটি পাতায় লিখে রাখতে হবে। পাতাগুলোতে প্রতিদিন চোখ বোলালেই অধ্যায়টি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে। কালরেখা ইতিহাস মনে রাখতে এ কৌশলটিই উত্তম।

বইয়ের সব অধ্যায় সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা নিয়ে গত ৪০০ বছরের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা বানাতে হবে। সেখান থেকে কে, কখন, কেন উল্লেখযোগ্য ছিলেন, সেটা সাল অনুযায়ী খাতায় লিখে রাখতে হবে। প্রতিদিন একবার করে চোখ বোলালেই খুব সহজে পুরো বই সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরী হবে। পড়ার সঙ্গে লেখা কোনো বিষয় পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে সেটি খাতায় লিখতে হবে। একবার পড়ে কয়েক বার লিখলে সেটা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়। পড়া ও লেখা এক সঙ্গে হলে সেটা মুখস্থ হবে তাড়াতাড়ি। এ পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হচ্ছে হাতের লেখা দ্রুত করতে সাহায্য করে। বিচ্ছিন্নতা অনেক মানুষের ভিড়ে আলাদা একজনের প্রতি নজর পড়ে। ঠিক তেমনি কোন নোটের মৌলিক পয়েন্ট গুলো আলাদা করে ডান পাশে লিখলে সহজে মনোযোগ আকর্ষণ করে। অর্থ জেনে পড়া পড়ার আগে শব্দের অর্থটি অবশ্যই জেনে নিতে হবে। কারণ বুঝে না পড়লে পুরোটাই বিফলে যাবে। শব্দের অর্থ ভান্ডার সমৃদ্ধ হলে কোনো পড়া ভুলে যাওয়ার আশংকা থাকে না। কল্পনায় ছবি অাঁকা বিষয় সদৃশ্য একটি ছবি অাঁকতে হবে মনে। গল্পের প্রতিটি চরিত্রকে মানুষ বা বস্ত্তর সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। তারপর সেই বিষয়টি নিয়ে পড়তে বসলে মানুষ কিংবা বস্ত্তটি কল্পনায় চলে আসবে। এ পদ্ধতিতে কোনো কিছু লিখলে সেটা ভুলে যাওয়ার আশংকা কম থাকে। আর মস্তিষ্ককে যত বেশি ব্যবহার করা যায়। তত ধারালো হয় ও পড়া বেশি মনে থাকে।

কেন’র উত্তর খোঁজা এ নিয়মটা প্রধানত বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য প্রযোজ্য। তাদের মনে সব সময় নতুন বিষয় জানার আগ্রহ প্রবল হতে হবে। অনুসন্ধানী মন নিয়ে কোনো কিছু শিখতে চাইলে সেটা মনে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। উজ্জ্বলতা সাধারণের ভিতর একটি উজ্জ্বল জিনিস আমাদের মনোযোগ কাড়ে। সুতরাং আমাদের উচিত বই বা নোটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ রঙিন মার্কার দিয়ে দাগিয়ে পড়া।

আরবীতে দক্ষতা অর্জন আরবীতে দুর্বলতা একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে অনেকাংশে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। পক্ষান্তরে আরবী ভাষায় দক্ষ হলে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন যেমন সহজ হয়, কর্মজীবনও হয় গৌরবময়। এজন্য পাঠ্য আরবী বইয়ের বাইরেও শ্রেণীভিত্তিক আরবী ওয়ার্ড বুক, অভিধান, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও আরবী সাহিত্য নিয়মিত পড়তে হবে।

অ্যারাবিক স্পিকিংক্লাব প্রতিষ্ঠা করে আরবী বক্তৃতা ও বিতর্কের আয়োজনও করা যেতে পারে। ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজিতে দক্ষতা ব্যতীত জীবনের সাফল্য কল্পনাও করা যায় না। সেই সঙ্গে রেডিও, টেলিভিশনের ইংরেজি খবর শোনা ও অনুষ্ঠানাদি দেখা, ইংরোজিতে কথোপকথন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ইংলিশ স্পিকিংক্লাব প্রতিষ্ঠা করে বক্তৃতা ও বিতর্কের আয়োজন করা। গণিতে দক্ষতা অর্জন ক্লাসের গণিত বইয়ের সকল অংক আয়ত্ব করার সঙ্গে সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন ক্লাসের ভুলে যাওয়া অংকগুলো অবসরে পুনঃচর্চা করতে হবে। সেই সঙ্গে গণিত বিষয়ক সম্মেলন, গণিত প্রতিযোগিতা, গণিত অলিম্পিয়াড ইত্যাদিতে অংশ নেওয়া খুবই প্রয়োজন। বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে হলে ক্লাসের বিজ্ঞানের বাইরেও বিজ্ঞান ম্যাগাজিন, দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞান পাতা, বিজ্ঞানের লেটেস্ট আবিষ্কার এসবের দিকে প্রতিদিন নজর রাখতে হবে। সাধারণ জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন বাংলাদেশ ও বিশ্বের অতীত, বর্তমানের সকল ঘটনা এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য মনে রাখাই সাধারণ জ্ঞানে দক্ষতা।

সাধারণ জ্ঞানে পারদর্শী হলে ছাত্র জীবনের যে কোন ভর্তি পরীক্ষা ও কর্মজীবনে বিসিএস সহ সকল প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় সহজে বিজয়ী হওয়া যায়। নিজের তথ্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে হলে নিয়মিত সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তে হবে। শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ইত্যাদির মধ্যে যে কোনো একটি পছন্দের বিষয়কে সুস্থ মন ও সুস্থ দেহের জন্য বেছে নিতে হবে। অবসরে বা দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে এর চর্চা করতে হবে। মুখস্থ বিদ্যাকে ‘না’ মুখস্থ বিদ্যা চিন্তাশক্তিকে অকেজো করে দেয়। পড়াশোনার আনন্দও মাটি করে দেয়। কোনো কিছু না বুঝে মুখস্থ করলে সেটা বেশিদিন স্মৃতিতে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয়, সচেতন ভাবে কোনো কিছু মুখস্থ করা যাবে না। টুকরো তথ্য, যেমন- সাল, তারিখ, বইয়ের নাম, ব্যক্তির নাম ইত্যাদি মনে রাখতে হবে।

কী মনে রেখেছি এর সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ে কী সম্পর্ক তা খুঁজে বের করতে হবে। খাবার খাবারের পরিমাণের উপর মস্তিষ্ক চালনা নির্ভর করে। ভাল ভাবে মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে চাইলে পেটে একটু ক্ষুধা রেখে খেতে হয়। অতিভোজনের ফলে রক্ত মাথা থেকে পাকস্থলীতে হজম ক্রিয়ার জন্য নেমে আসে। ফলে মস্তিষ্কের ক্রিয়ার ব্যঘাত হয়। তদ্রুপ অনাহার ও মস্তিষ্কের ক্রিয়ায় সমস্যা করে। এছাড়াও নিয়মিত কোষ্টশুদ্ধি, প্রচুর অক্সিজেন, ঘুম, সময় ও পরিবেশ এর প্রভাবে একজন শিক্ষার্থীকে মেধাবী হতে সহায়তা করে। পরিশিষ্ট চলমান বিশ্বে চলছে মূলত জ্ঞানের যুদ্ধ। বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানের দিক দিয়ে যারা অগ্রগামী হবে, তারাই আবির্ভূত হবে নতুন বিশ্বের নতুন পরাশক্তি হিসেবে। এই যুদ্ধে মুসলিম জাতিকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে হলে জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় অগাধ, বুৎপত্তি অর্জনের কোন বিকল্প নেই। আমরা যোগ্যতা অর্জনের যুদ্ধে শক্তিশালী পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করবো না, বরং তাকে চ্যালেঞ্জ করবো, তাকে হারিয়ে দেব, ইনশাআল্লাহ্।

 

Use Facebook to Comment on this Post