ঈদ আসতে আর তেমন দেরি নাই । হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকদিন বাকি । পরিবারের সবাই বায়না ধরল, আমাদের ঈদের কাপড় চাই । সবাই কাপড় ক্রয় করে ফেলেছে । এমনকি পাশের ফ্লাটের ছোট্ট মেয়েটির সহ সবার জামা ক্রয় করা হয়ে গেছে । তাদের গুলো কই ?
রাতে বাসায় আসলে পাশের ফ্লাটের ছেলে-মেয়েদের কথাগুলো কান দিয়ে শুনে । দিন যত ঘনিয়ে আসছে চিন্তা ততই বাড়তে লাগল ।

সাখাওয়াত বাবু একটি রেষ্টুরেন্টে চাকরি করে । অল্প বেতন (৫,০০০-৬,০০০) হাজার টাকা । গত মাসে রেষ্টুরেন্ট চুরি হওয়ায়, হয়ত এবার ঈদের বোনাসও কপালে জুটবেনা ।
আবার আদরের ছোট্ট ছেলেটি নির্দিষ্ট করে দিছে তার নীল পাঞ্জাবী লাগবে । ছোট ছেলেটির কথা শুনে বুকটা যেন দুরুদুরু করতে লাগল । ছোট ছেলেটির বায়না অন্যদিকে পরিবারের প্রয়োজনীয় সকল খরচ কিভাবে সামান্য বেতন দিয়ে সামাল দিবে তা ভাবছে ।
পরদিন, অল্প বেতনের টাকা নিয়ে বাসায় ফিরল ।
বাসায় আসলে ছেলেটি জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে ।
আব্বু, আমার পাঞ্জাবী কই ?
সাখাওয়াত বাবু লজ্জিত কন্ঠে বলে ওঠল, আব্বু আজকে অনেক কাজ ছিল । তাই ক্রয় করা হল না । কালকে অবশ্যই নিয়ে আসব । এই বলে শান্তনা দেই ছেলেকে । অল্প টাকা দিয়ে কিভাবে সবার চাহিদা পূরণ করা যায় তা বসে বসে ভাবতে লাগল ।
স্বামীর দিকে তাকানোর পর স্ত্রী বুঝতে পারল, স্বামীর করুণ অবস্থা । স্ত্রী ও তার স্বামীকে আর অন্য কিছু জিজ্ঞেস করল না । চারদিকে উৎসবের আমেজ ।
সন্ধ্যার পর, রাত্রে চাঁদের আলোতে আলোকিত পুরো পৃথিবী । আকাশে মেঘের লুকোচুরি খেলা । চারদিকে নিস্তব্ধ । জোনাকিরা এলোমেলো করে চারদিকে আলো দিতে থাকে । জোনাকিরা তাদের মত করে চারদিকে ঘুড়ির ন্যায় ঘুরতে লাগল । পুরো পৃথিবী ঘুমের শহরে আচ্ছন্ন । চারদিকে কারও কোন সাড়া নেই । সাখাওয়াত বাবু এখনও জেগে আছে । আর এখন টিকটিকি আর ভয়ঙ্কর কালো মশা তার একমাত্র সঙ্গী । ভাবতে থাকে, কালকে কিভাবে সবার বায়না পূরণ করবে । ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন সাখাওয়াত বাবু ।
সকাল হতে না হতে মুয়াজ্জিনের মধুর আযানের ধ্বনির সাথে সাথে ছেলে বলে ওঠল, আব্বু পাঞ্জাবী কিনতে যাবেন না ।
চোখ মুছতে মুছতে সাখাওয়াত বাবু বলে উঠল,আর একটু সময় হোক ।
তারপর আমি, তোমার আম্মু, তুমি আমরা সবাই একসাথে বিকালবেলা বের হব ।

বিকালবেলা, মাথার উপরে সূর্যের ৩৫ (ডিগ্রি) তাপমাত্রা আস্তে পরছে । পায়ের নিচে চকচকে শুকনো বালুকণা । পায়ে একজুড়া ছেঁড়া চামড়ার জুতো । পরনে, গায়ে ময়লা একটা সাদা রঙের শার্ট আর ঝলছে যাওয়া একটা গাঢ় নীল রঙের একটি প্যান্ট । পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, পরিবারের সকলের জন্য জামা ক্রয়ের উদ্দেশ্য । পাশের মার্কেটের প্রথম দোকান থেকে দেখতে শুরু করল । দু’একটি দোকান দেখতে দেখতে ৩ নাম্বার দোকানে প্রবেশ করল । সেখানে গিয়ে ছেলেটির একটি নীল পাঞ্জাবী পছন্দ হল । ছেলে পাঞ্জাবীটি খুব পছন্দ করেছে । সবাই অনেক খুশি ছেলের পছন্দের জামা পাওয়া গেল । সাখাওয়াত বাবু জিজ্ঞেস করল,
– জামাটার দাম কত ?
– ২,০০০ টাকা এটি ।
দাম শুনে, সাখাওয়াত বাবুর মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত ।
– কম হবেনা ভাই ?
– কত দিবেন আপনি ?
– ১,০০০ টাকা দেই ।
দোকানি পাশের অন্য দিক থেকে একটি জামা দেখিয়ে বলল…….
– এটা নেন । ১,০০০ টাকা রাখবো ।
– কেন ভাই এটা দেওয়া যাবে না ?
– এটা নিলে ১,৫০০ টাকা লাগবে ।
সাখাওয়াত বাবুর মুখটি শুকিয়ে গেল, সাথে তার স্ত্রীর ও ।
সাখাওয়াত বাবু আবার জিজ্ঞেস করল…..
– ভাই, এটা কি আর একটু কম হবে না ।
– না, একদাম ।
ছেলেটির মা অশ্রুমাখা কন্ঠে ধর্মের দোহায় দিয়ে ছেলেকে বলে উঠল…..
বাবা, জামাটা তোমার গায়ে মানাবেনা । আর ঈদের সময় কি মুসলমানের ছেলেদের হিন্দুদের দোকান থেকে কাপড় কিনে ঈদ করা যাবে । তখন ছেলেটির কাছে তার এক কুসংস্কারে বিশ্বাসী বন্ধুর কথা মনে পড়ল, সে বারবার বলত ‘ হিন্দুদের গায়ের সাথে লাগলেও মানুষ অপবিত্র হয়ে যাই ‘। পরে আবার নতুন ভাবে গোসল করে পবিত্র হতে হয় । তাই হিন্দুদের দোকান থেকে কিভাবে কাপড় ক্রয় করে মুসলমানদের ঈদ করা যাই । এই বলে, শান্তনা দিয়ে মাথা নিচু করে মা ও সাখাওয়াত বাবু বের হয়ে যাই ।
চলো, আমরা অন্য দোকানে গিয়ে দেখি । তবুও ছেলেটি বারবার পিছনে পছন্দের জামার দিকে তাকিয়ে অন্য দোকানে প্রবেশ করল । সাখাওয়াত বাবু ছেলেটিকে বলল, দেখ এখান থেকে তোমার কোন জামা পছন্দ হয় কিনা ।
ছেলেটি মায়ের পাশ গিয়ে বলে, মা তুমি পছন্দ করে দাও । তখন পৃথিবীর অমূল্য ধন, বেহেস্তের প্রাপ্ত স্থান, দুঃখনী মায়ের আর বুঝতে বাকি রইল না । ছেলেটি ঐ পাঞ্জাবীকে অনেক পছন্দ করেছে । তবু মা বলে ওঠল, ভাই জামাটা দেখান ?
দোকানি জামাটিকে হাতে নিয়ে দিল । ছেলেটির মা জিজ্ঞেস করল…..
– দাম কত জামাটার ?
– ১,৫০০ টাকা দেন আপা !
– কম কত ?
– ১০০ কম দিয়েন ।- না, ১,০০০ টাকা দিই ।
দ- না, আপা । আপনি আমাদের ক্যাশমেমো দদেখতে পারেন । এই দামে আমাদের ক্রয়মূল্য নেই । এটা নিলে আপনার জন্য একদাম ১,৩০০ টাকা রাখব ।
– আর, কম হবে না ?
-না ।
তখন ছোট্ট ছেলেটির ও আর বুঝার জন্য সময় রইল না, বাবার পকেট শূণ্য ।
ছেলেটির মা জামা দেখিয়ে বলল….
দদ- এটা তোর পছন্দ ।
– না, মা ।
– ছেলেটি পাশ থেকে অল্প দামের অন্য জামা দেখিয়ে বলল, এটা নিব ।
– ছেলেটির মা জিজ্ঞেস করল, এইটার দাম কত ?
– ১,০০০ টাকা ।
– এটা তোমার পছন্দ হয় ।
– হুম ।
– আচ্ছা, মা বোকা কন্ঠে বলে উঠল….
– এটা প্যাক করেন ।
ছেলেটি বুঝতে পারে, কি কারণে পছন্দের জিনিস মানুষের কপালে জুটে না । বাবার অল্প টাকা দিয়ে বাসার সবাইকেও জামা দিতে হবে । তাই সে নিজেই কম দামী জামা ক্রয় করল ।
পরে, বড় মেয়ের জন্য একটা ১,০০০ টাকার থ্রি- পিস ও জুতো ক্রয় করা হল ৫০০ টাকার । কথা বলতে বলতে পকেটের কথা চিন্তা করছে সাখাওয়াত বাবু ।
তার অনেক দিনের ইচ্ছে, এবার ঈদে বউটাকে দামি সুন্দর একটি শাড়ি কিনে উপহার দিবে । তিনি বাবা, আপনজনের মুখে হাসি ফুটাতে নিজ সুখকে মাটি চাপা দিয়ে দিল । মুহূর্তে তার নতুন শার্ট কেনার স্বপ্নকে মাটিতে মেরে ফেলল ।
স্ত্রীকে বলল…..
– দেখ ও, শাড়ি দেখ ।
– শাড়ি লাগবেনা বললাম না,
– বাবু সাহেব, একটু জোর দিয়ে বলল । যেটা বলছি সেটা শোন ।
সাখাওয়াত বাবু নিজেই স্ত্রীকে পছন্দ করে ২,৪৯০ টাকার একটি শাড়ি কিনে দিল । জামা-কাপড় সব শপিং করা শেষ ।
– স্ত্রী বলে উঠল…..
– তুমি শার্ট নিবে বললে না, নিবে না ।
– আমি পরে নিব ।
– টাকা নাই ?
– আছে তু । ছেলের জুতো ক্রয় করে বাঁচলে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কিনবো ।
অন্য দোকানে গিয়ে দরকষাকষি করে ছেলের জন্য ৪৬০ টাকা দামে এক জুড়া জুতো ক্রয় করল । অবশিষ্ট পকেটে আর কত টাকা বাকি রইল সেটা চিন্তা করতে লাগল সাখাওয়াত বাবু । পকেটে আর মাত্র ৫৫০ টাকা অবশিষ্ট রইল’
তখন রাত । যাবার গাড়ি ভাড়া চিন্তা করতেছে । ভাবছে, বাকি টাকা দিয়ে ঈদের আয়োজনটা ছেড়ে নেবে ।
অন্যদিকে, নতুন মাস শুরু ।
বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এসে হাজির । আর কিছু ক্রয় না করে বাড়ির উদ্দেশ্য সবাই মিলে গাড়িতে উঠল । রাতের অন্ধকারে গাড়ি চলতে থাকল ।

LikeShow more reactions

Comment

Comments