জোগালদর লেখক | রেজা তানভীর

অাবুল মনসুরের বাবা অনেক সম্পত্তির মালিক ছিল।কিন্তুু সে কোনো সম্পত্তি রক্ষা করতে পারেনি।পৈতৃক সূত্রে অনেক সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও সে জায়গাজমি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেনি। অাবুল মনসুর একবার বার্মা গিয়েছিলেন চাকরি করার অাশায় কিন্তু সেখানে বিদেশী লোকজনের সাথে বনিবনা না হওয়ায় অনেকটা ঝগড়া করেই সে দেশে ফিরে অাসে।তখন সে টগবগে যুবক।দেশে এসেও সে তেমন বেশী সুবিধা করতে পারেনি।এলাকায় ছোটখাটো একটা মুদি দোকান দিয়েছিল সে।কিন্তু ব্যবসায় অাগ্রহ না থাকা ও ব্যবসার হিসাব নিকাশ ঠিকমত বুঝে ওঠতে না পারার কারণে তার দোকান বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।অাবুল মনসুর বিয়ে করেন। বিয়ে করার পরপরই দোকান করা ছেড়ে দিয়ে বসে বসে খেতে থাকেন।কোন কাজকর্মে নিজেকে জড়াতে পারেননি শুধুমাত্র অলসতার কারণে।চাকরিতে গেলে কারো সাথে বনিবনা না হওয়ায় কিছুদিন পর পরই চাকরি ছেড়ে দেন। একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানীতেও চাকরি নিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে ম্যানেজার তাকে গরম করে কথা বলায় ম্যানেজারের গায়ে চেয়ার ছুঁড়ে মেরে দিয়েছিল।যার ফলে বেশ কয়েকমাস তার জেলেও কাটাতে হয়েছিল। এভাবে চার বছর চাকরি অদল বদল করার পর সে মনস্থির করল সে এখন থেকে বসে বসে খাবে।অাবুল মনসুরের বাপ যে সম্পত্তিগুলো রেখে গিয়েছিলেন সেগুলোর দিকেই তার নজর গেল।সে একদিন পুকুর পাড়ে গিয়ে ভাবলেন সে তো বাপের এক ছেলে এত জায়গা জমি কে খাবে!বসে বসেই তো খাওয়া যায়।অাবুল মনসুরের মাথায় বুদ্ধি চাপল তিনি জমি বিক্রি করবেন।সে অাস্তে অাস্তে করে জমি বিক্রি করার বিভিন্ন উপায় বের করলেন। অাবুল মনসুর অনেকটা অনুনয় বিনয় করেন গ্রামের মফিজউদ্দীনের কাছে তার জমিটা নেয়ার জন্য।তার বাড়ির দক্ষিণ পাশের জমিটা বিক্রি করে দিলেন।মফিজউদ্দিন চাল ডাল দেয়ার মাধ্যমে কিছু জমি কিনে নিলেন।মাঝে মাঝে মফিজ উদ্দীনের পরিবারের থেকে চাল ডাল নিয়ে যান অাবুল মনসুর।ডাল চাল কিংবা খুব নামমাত্র বিনিময়ে অনেক গুলো জমি বিক্রি করে দেন গ্রামের অন্যান্য মানুষের কাছেও।অাবুল মনসুরের কাছে বেশ ভালো লাগে শারিরিক পরিশ্রম ছাড়াই তো সে খেতে পারছে।অার কি লাগে!বাকি জীবন এভাবে কাটিয়ে দিলেই হয়। অাবুল মনসুরের বিয়ের পর তার অলসতা অারো বেড়ে গেল।বউকে সে উঠতে বসতে পিঠায়।বউ পিঠানোকে সে পৌরুষত্বের প্রতীক বলে মনে করে। ‘ওই সখিনা,তুই কই গেলি’ বলে জোরে হাঁক ডাকেন।অাবুল মনসুর চায় তার বউ সারাদিন রান্না বান্নার কাজ করুক অার বাড়িতেই থাকুক।পাশের বাড়িতে যাওয়া সে একদম পছন্দ করেনা।অার অপরিচিত কোনো পুরুষের সাথে কথা বলতে দেখলে সেদিন তার বউয়ের অার রক্ষা নাই।চুল টেনে টেনে মারতে থাকেন অার বলতে থাকেন বাপের বাড়ি চলে যা’……. অাবুল মনসুরের প্রথম ছেলে হয় বিয়ে করার বছরখানেক পরই।নাম রাখা হয় জয়নাল।জয়নাল দেখতে খুব সুন্দর। জয়নাল যখন একটু বড় হয় তখন সে স্কুলে ভর্তি হয়।পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল সে।জয়নাল যখন স্কুলে যেতে থাকে,তখন তার মা খুব উৎসাহ দিত পড়াশোনা করানোর জন্য।ছেলে স্কুলে যাওয়ার অাগে কখনো গরম ভাত দিতে পারেননি তার মা সখিনা।দিনের পর দিন যখন অাবুল মনসুর শুয়ে বসে দিন কাটায় তখন সে ছেলেকে কি দিতে পারবে! জয়নাল যখন পঞ্চম শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ওঠে তখন তার বাবা অাবুল মনসুর বলে, ‘তর অার স্কুলে যাওনের দরকার নাই,কাইলকা থেইক্যা সিরাজ মেস্ত্রীর লগে জোগালদারের কাম করবি’। জয়নাল বুঝে ওঠতে পারেনা, কি বলবে!পাশের রুম থেকে জয়নালের মা তা শুনে।সে দৌড়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,’ অামার বাইচ্চা পোলাটা ক্যামনে কাম কইরবো?পোলার গায়ে কি শক্তি অাছে নে? ‘পোলারে কাইলকা থেইকা রাজমিস্ত্রীর জোগালদারের কামে পাঠাইবি কইলাম’ অাবুল মনসুর তার বউকে খৃব গরম করে কথাটা বলে। জয়নালের বয়স কতই বা হবে অার, বেশি হলে ১৩ বছর।সে কি প্রতিবাদ করতে পারে তার বাবার কথার উত্তরে। ‘রাজমেস্ত্রীর জোগালদারের কি কাম মা?’ জয়নাল কিছুক্ষণ পর অাস্তে অাস্তে তার মাকে বলল। -তুই রাজমেস্ত্রীর হেলপার।তরে মেস্ত্রীর লগে জোগালির কাম কইরতো অইবো। -বাপের তো এহনো ম্যালা শক্তি, হে কাম করতে পারেনা? -তর বাপরে অামি বিয়ার পর থেইক্যা দেখতাছি বইসা বইসা খাইতেছে,তর দাদার জমি জায়গা সব বেইচ্চ্যা এখন চলবার মত ট্যাকা পয়সাও নাই।তবে তোরে লই অামার ডর অয়।তরে মনে হয় অার অার পড়ালেখা শিখাইতে পারুম না।সখিনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেলেন। পাশের রুম থেকেই অাবুল মনসুর কথাগুলো শুনছিল।সে তো শুনে রেগেমেগে অাগুন।তারপর তার বউকে চুল টেনে টেনে মারতে শুরু করল। তারপর চিৎকার করে শাসাতে লাগল, ‘তর জন্য পোলাটা নষ্ট হয়ে গেল’। জয়নাল সব দেখে কিন্তু বাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস হয়না,তার মাকে যে পিঠায় সেটা দেখে শুধু সে চোখের পানি ফেলে। কয়মাস পর। জয়নাল এখন রাজমেস্ত্রীর জোগালদার। ১০ তলা বিল্ডিং এর নির্মাণ কাজ করছে এলাকার সবচেয়ে নামকরা মেস্ত্রীর জোগালদার হিসেবে।ছোট হাত,ছোট পা,দেহগড়নও ছোট।মাথায় বালু নিয়ে এক তলা থেকে তিন তলা, তিন তলা থেকে পাঁচ তলায় ছুটতে হয় তাকে।কখনো তার থেকেও বেশি ওজনের সিমেন্টের বস্তা তাকে মাথায় নিতে হয়। কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সিড়ি বেয়ে ওঠার সময়।মাঝে মাঝে পা পিছলে পড়ে যায়।মেস্ত্রীদের বস যিনি অাছেন,তিনি মা তুলে গালি দেনন।জোরে চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘কি পোলা হইছস,সামান্য এই বস্তাটা অালগাইতে পারস না।মেস্ত্রী সিরাজের কাছে পঞ্চাশ কেজি ওজনের বস্তাটা সামান্য মনে হয়।দিনশেষে খাটুনি শেষে ২৮০ টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে জয়নাল। ১৩ বছর বয়সী জয়নাল যখন মাথায় ৫০ কেজি ওজনের সিমেন্টের বস্তা অালগায় তখন তার মনে হয় এই পৃথিবীর সমস্ত ওজন তার মাথার উপর ভর করছে।এই কাজ না করলে অার দিন শেষে বাপের পকেট খরচের টাকা দিতে না পারলে বাপ তাকে ঘরে ঢুকতে দিবেনা। কিশোর জয়নাল কোথায় যাবে,কার কাছে অাশ্রয় নিবে ভেবে পায় না সে।মাথায় সিমেন্টের বস্তা নিয়ে সে যখন এককদম বাড়ায় অারেক কদম নেয়ার শক্তি থাকেনা।পৃথিবী হাসে, মেস্ত্রী সিরাজ অার অার অাবুল মনসুররা হাসে।তাদের অট্টহাসিতে খল খল করে নড়ে ওঠে সব।দিনশেষে তাদেরই জয় হয়।বলির পাঠা বানানো হয় জয়নালদের।

Use Facebook to Comment on this Post