গেঞ্জু মিয়ার অাখ্যান | রেজা তানভীর

গেঞ্জু মিয়া শহরে গার্মেন্টসে দারোয়ানির চাকরি করত।সেই গার্মেন্টসের অধিকাংশই পুড়ে যাওয়ার কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।যার ফলে গেঞ্জু মিয়ার চাকরিটাও চলে যায়। গেঞ্জু মিয়ার বয়স হয়েছে,৭০ এর কাছাকাছি বয়স,চোখে ভালো ঠাহর করতে পারেনা।গেঞ্জু মিয়ার বাড়ি অামার গ্রামেই,ছোটবেলা থেকেই চিনি।অামাদের বাড়ি তারপর দুটো পুকুর, দুই পুকুরের মাঝখানে একটা তালগাছ,তারপর দুটো বরই গাছ,কয়েকটা চা অার মুদি দোকান তারপর গেঞ্জু মিয়ার বাড়ি।উনাকে চাচা বলেই ডাকি। সকালে রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম,হঠাৎ তিনি জোরে ডেকে ওঠলেন, :ওই অাসাদ মিয়া,কই যাও? :চাচা,হাটে যাই :ক্যান হাটে যাও? :সামান্য বাজার সদাই করব :তো,অাপনার কি খবর চাচা? :গার্মেন্টেসের চাকরিটাতো চইল্যা গেল :হ,জানি চাচা,তো এখন অাবার কোথাও চাকরি করার কথা ভাবছেন? :ভাতিজা,হুনো, অামি ভাবতাছি গ্রামে একখান মুদি দোকান দিমু। চাল, ডাল, অালু, পেয়াজ বেচমু অামি প্রশ্ন করলাম উনাকে অাপনার বয়স কত হইছে চাচা? জবাব দিলেন,৭০ চলতাছে :তাইলে এই বয়সে অাপনার তো বসে বসে খাওয়া কথা।অাপনি ক্যান কষ্ট করে দোকান দিবেন? গেঞ্জু মিয়া অামার কাছ থেইক্যা এই কথা শোনার পর অামার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন,তারপর নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ওঠলেন,অারে হুনো, তুমি তো এখনো ম্যালা ছোড,জীবন সম্পর্কে কি বুঝবা? অামি বললাম,অাপনার ছেলে অাছেনা,অাসমত ভাই,তারে তো অাপনে জমি জমি বেইচা বিদেশ পাঠাইলেন?হে মিয়া অাপনেরে টাকাটুকা দেয়না? গেঞ্জু মিয়ার শরীর থেকে তখন দরদর করে ঘাম ঝরছে, পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বের করতে করতে তিনি বললেন,একটামাত্র পোলা,মাইয়াগুলারে বিয়া দিয়া জামাইর বাড়িত পাঠাইছি।পশ্চিম দিকে মাস্টারদের বাড়ির পিছনে যে জমিটা অাছিল হেইটা বেইচা,ধারকর্য কইরা অাসমতরে বিদেশ পাঠাইলাম,বিয়া করাইলাম।প্রথম কয়েক বছর টাকা পাঠাইত অামার নামে।বিয়া করানোর পর থেইক্যা অামারে অার টাকা দেয়না।অামারে অার তোমার চাচীরে বউ অার পোলা অালাদা করে দিছে।বলতে বলতে তার গলা ধরে ওঠে।চোখ দিয়ে পানি ঝর ঝর করে বেয়ে যায়,তারপর অাবার বলতে লাগলেন,চলতে খুব কষ্ট হয়,শহরে দারোয়ানির চাকরিটা চইল্যা যাওনের পর থেইকা কষ্টটা অারো বাড়ছে,ব্যাংকে কিছু টাকা জমা রাখছিলাম, সেগুলো দিয়া একটা মুদি দোকান দিমু ভাবছি। অামি চুপ করে খুব মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শোনতে লাগলাম। এই এলাকায় তো অনেকগুলো মুদি দোকান,অাপনের এখানে এই ব্যবসা চালাইতে পারবেন?তার উপর অাপনের বয়স হইছে,অামি জিজ্ঞাসা করলাম। অারে,পারি না পারি সেইটা নিয়া তোমারে এত মাথাঘামানোর দরকার নেই,গেঞ্জু চাচা এই বলেলে চেঁচিয়ে ওঠলেন। তারপর গেঞ্জু চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।তারপর অামার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন,ভাতিজা, দেখো, অামার কিছু করার নাই,অামারে কোনো রকম চলতো হইবো। :অাগে কোনদিন দোকান করছিলেন? :না,ভাতিজা,না। :অাপনে একলা দোকান সামলাইতে পারবেন? :পারতি হবে :হুম বুঝছি :দোকানের লাইগা একটা পোলা রাখতে পারলে বালা হয় :তাহলে তো তাকে বেতনও দিতে হবে :হৃম তা তো দিতে হবে,লাভ না হলে দিমু ক্যামনে? :হ,তা তো ঠিক কিছুক্ষণ পর একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠলেন,হুনো ভাতিজা,তুমি অামার দোকানে একটুখানি সময় দাওনা!! অামি ডানে বামে তাকিয়ে দেখলাম অাশেপাশে কেউ অাছে কিনা,দেখলাম কেউ নাই,তারপর উনার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,অামার তো সময় নেই,চাচা।এই বলেই বাড়ির দিকে ছুটে চললাম। বাড়িতে এসে অাম্মাকে বললাম,অাম্মা গরম করে এক কাপ চা দ্যান…. :তুই তো বাইরে থেকে এসে চা খাস না.. :অাজকে খাব :অাচ্ছা দিচ্ছি,অপেক্ষা কর :তাড়াতাড়ি দ্যান,খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে অাম্মা চা দিল,অামি চা নিয়ে বাড়ির বারান্দার যে পাশটা থেকে গেঞ্জু মিয়ার বাড়ি দেখা যায় সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম,অার ভাবলাম,অাহারে বুড়ো হলেও লোকটির জীবিকা সংগ্রাম থেমে নেই।

Use Facebook to Comment on this Post