৪০০ টাকা বেতন থেকে ঘনশ্যামের দেড় কোটির টার্নওভার | হিন্দোল গোস্বামি

কথায় বলে ব়্যাগ টু রিচ স্টোরি। দারিদ্র থেকে মাথা তুলে সাফল্যের শীর্ষ ছোঁয়ার গল্প। আজ এমনই এক গল্প শোনাবো আপনাদের। ঘনশ্যাম প্রধানের কাহিনি।

ভদ্রলোক মেদিনীপুরের ছেলে। গ্রামের নাম ফাজেলপুর। যারা ওদিকে যাতায়াত করেন তাঁরা জানেন। যারা ওদিকে যান না তাঁদের বলে রাখি কলকাতা থেকে বাস যায়। দীঘা যাওয়ার বাসে নামতে হয় হেঁড়িয়ায়। সেখান থেকে ছোট রিক্সা কিংবা ট্রেকার ভ্যানে কুড়ি কিলোমিটার গেলে ছোট্টগ্রাম ফাজেলপুর। এই গ্রামের ছেলে ঘনশ্যাম প্রধান। এই কুড়ি কিলোমিটার ওকে বহুবার হেঁটে যাতায়াত করতে হয়েছে। সাইকেল জুটেছে মাধ্যমিকের পর। বাড়ি থেকে স্কুল তিন কিলোমিটার দূরে। পায়ে হেঁটেই যেতে হত। ওঁর যখন দু বছর বয়স বাবা চোখ বোজেন। বাবার মুখটা তাই ভালো করে মনেও নেই। নাম স্বর্গীয় রজনীকান্ত প্রধান। খাতায় কলমে সমস্ত সরকারি কাগজপত্রে এই নামটা কাজে লেগেছে। কিন্তু আসলে ছোটবেলায় বাবার দায়িত্ব পালন করেছেন ঘনশ্যামের তিন দাদা। দুই দাদা থাকতেন গ্রামে। বড় দাদা ছুতোরের কাজ নিয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। গ্রামে দাদারা চাষবাস করতেন। লেখাপড়া শিকেয় তুলে দুবেলা দুমুঠো অন্নের জোগাড় করতেই মাস কাবার হয়ে যেত। কিন্তু মেধাবী ভাইয়ের পড়াশুনো বন্ধ হতে দেননি। ক্লাসে প্রতিবার স্ট্যান্ড করতেন ঘনশ্যাম। সেই লড়াই শুরু। পঞ্চগ্রাম শিক্ষানিকেতন থেকে বেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক স্কুল। তারপর কলকাতা। বড় দাদা কনস্ট্রাকশন লাইনে কাজ করতেন। তিনিই ডেকে নেন ঘনশ্যামকে। লাগিয়ে দেন কাজে। লেবারদের ওপর সুপারভাইজারি করার কাজ। বয়স কত হবে! আঠারো উনিশ। দিনে রাজমিস্ত্রি লেবারদের ওপর নজরদারি আর রাতে শ্যামা প্রসাদ কলেজে অ্যাকাউন্টেন্সি অনার্স। বেহালার আস্তানা থেকে কলেজ আসার বাসের মান্থলি ছিল। ১৯৯১ সাল। আজ থেকে প্রায় ২৬ সাতাশ বছর আগের কথা গল গল করে বলছিলেন কোটি পতি উদ্যোগপতি ঘনশ্যাম প্রধান। বলছিলেন তখন বাসের মান্থলি ছিল তিরিশ টাকা। তাইই অনেক মনে হত।

কলেজে পড়া একটু সিরিয়াস হয়ে পড়ায় কনস্ট্রাকশন লাইন ছাড়তে বাধ্য হলেন প্রধান। যোগ দিলেন জমি বাড়ির দালালির একটি অফিসে। সারাদিন সেখানে কাজ করে কলেজ। যাতায়াতের পথেই ছিল সেই অফিস। বছর খানেক কাজ করেছেন সেখানে। মনে আছে প্রথম মাইনে ছিল চারশো টাকা। তারপর কী হল ওই দালালির দফতরের ঠিকানা বদল করার কথা উঠল। ঘনশ্যাম ওখানে সামান্য চাকরি করতেন। কিন্তু তবু তো চারশো টাকা দাদার হাতে তুলে দিতে পারতেন। থাকতেন বেহালায় দাদার কাছে। সরকারি বাসের মান্থলি তিরিশ টাকায় যাতায়াত একেবারে অঙ্ক কষা। তার থেকে বেশি হলে নিরুপায় ঘনশ্যাম। এরই মধ্যে ডাক পেলেন একটি লজিস্টিকস কোম্পানি থেকে। এল এস ক্যুইক প্যাকার্স অ্যান্ড মুভার্স। সেটাও যাতায়াতের পথে। সেখানে প্যাকারের কাজ পেলেন। মালিক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন কত মাইনে পেতে? সপাটে উত্তর ছিল চারশো টাকা। সেই টাকাতেই প্যাকার্সের কাজ শুরু। ধীরে ধীরে সমস্ত কাজ শিখেছেন। অর্ডার ধরা। প্যাকিং করা। মাল পৌঁছল কিনা সেটা ট্র্যাক করা। রীতিমত সুখ্যাতি হয়ে গিয়েছিল বাজারে। এই সেই অফিস যেখানে ঘনশ্যাম বাবু প্রথম টাইপ মেশিনে হাত দিয়েছেন। টাইপ শিখেছেন। পরে কম্পিউটারের ব্যবহার শিখেছেন। প্রিন্ট নিতে শিখেছেন। ধীরে ধীরে ব্যবসার আকাশটাও চিনতে শিখেছেন ঘনশ্যাম। ৬ বছরে মাইনে এঁকে বেঁকে চারশো টাকা থেকে দুহাজার দুশো টাকায় ঠেকেছে। ১৯৯৯ সাল। তখন দুহাজার দুশো টাকা খুব একটা বেশি কিছু নয়। তবে সাহস নিলেন তিনি। নিজে কিছু করার সাহস। চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। খুললেন ব্যবসা। প্যাকিংয়ের ব্যবসা। দাদারা আপত্তি জানালেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন মাথাটা গেছে। দাদাদের সঙ্গে মতবিরোধে বাড়িও ছেড়ে দিলেন। শুরু করলেন একা থাকা। যার বাবার মুখ মনে পড়ে না। মা মারা গিয়েছেন কৈশোর কাটতে না কাটতেই। তার আবার কিসের শিকড়ের টান। তাই ঝুঁকি নিলেন ঘনশ্যাম। স্বীকার করলেন, প্রথম প্রথম লড়াই কঠিন ছিল। কিন্তু বাজারে ব্যক্তি প্রধানের সুখ্যাতিও ছিল। প্রপ্রাইটারশিপ কোম্পানি খুললেন। পারফেক্ট প্যাকার্স অ্যান্ড মুভার্স। দূর দূরান্তের অর্ডার আসতে লাগল। একটা দারুণ গুণ ঘনশ্যাম বাবুর তিনি কারও উপকার ভুলে যান না। আলাপচারিতায় অনেকের নাম বলছিলেন যারা তাঁর পাশে না দাঁড়ালে তিনি সফল হতেই পারতেন না বলে তিনি মনে করেন। এর মধ্যে দুটি নাম বারবার অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ঘুরে ফিরে এসেছে। এক আমরা রাজা ব্যাটারি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার সত্যজিৎ চক্রবর্তী। অন্যজন সঞ্জয় শাহ নামের এক ভদ্রলোক।

সত্যজিৎ বাবু প্রথমবার দূরপাল্লার অর্ডার দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে প্রথম আহমেদাবাদে মাল পৌঁছনর বড় অর্ডার। ৪৪ হাজার টাকার কাজ। ফিফটি পার্সেন্ট অগ্রিম চেক কেটে দিয়েছিলেন। সমস্যা দুটি সংস্থার নামে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট ছিল না। আর মাত্র বাইশ হাজার টাকায় তো আর ট্রাক যাবে না। ড্রাইভারের খরচ আছে আরও আনুষঙ্গিক খরচাপাতি আছে। টাকা পাবেন কোথায়। জমানো বলতে কিচ্ছু ছিল না। তখন দেবদূতের মত উদয় হলেন সঞ্জয় শাহ। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন ঘনশ্যাম সেই বাড়িওয়ালার বন্ধু সঞ্জয়বাবু। কোনও রকম দ্বিধা না করে নিজে থেকেই টাকাটা দিয়েছিলেন ঘনশ্যামকে। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুললেন। টাকাটা হাতে পাওয়ার পরই সঞ্জয়বাবুর ঋণ শোধ করে দিলেন ঘনশ্যাম। তারপর যখনই প্রয়োজন পড়েছে ঘনশ্যাম প্রধান সঞ্জয়বাবুকে পাশে পেয়েছেন।

শূন্য থেকে শুরু করে একটা মানুষের উত্থানের সেই হল সূচনা লগ্ন। একের পর এক অর্ডার এসেছে। ব্যবসা বেড়েছে হু হু করে। পাঁচ ছজন কর্মীকে নিয়ে রাতদিন এক করে পারফেক্ট প্যাকার্স অ্যান্ড মুভার্স কাজ করে গেছে। ২০০২ সালে ফ্ল্যাট বুক করেছেন। ২০০৩ এ বিয়ে করেন শুক্লাদেবীকে। দেখাশোনা করে বিয়ে দেন বাড়িওয়ালা দাদা বৌদি। রেজিস্ট্রি বিয়ে। ২০০৪ সালে বড় মেয়ে রুদ্রপ্রিয়া জন্মায়। সেই সময় মুকুন্দপুরে জমি কেনেন। ফ্ল্যাট ছেড়ে বাড়ি করার কথা ভাবেন। ২০০৫ এ স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা লোন পান। বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। ব্যবসার প্রয়োজনে এখানে সেখানে যেতে হয় প্রয়োজন পরে একটা গাড়ির। ২০০৭ সালে ছোট্ট একটা কালো অল্টো গাড়ি কেনেন ঘনশ্যাম বাবু। নিঃস্ব একটা মানুষ কেবল ক্রমাগত অধ্যবসায় দিয়ে শূন্য থেকে শুরু করে মাথার ওপর ছাঁদ পেয়েছেন। স্বপ্ন দেখার জন্যে একটা বিস্তীর্ণ আকাশের মত স্ক্রিন। ছুটে বেড়াবার জন্যে মেহনতি ঘোড়ার মত কালো অল্টো। রুদ্রপ্রিয়ার পর শুক্লা ঘনশ্যামের জীবনে উঁকি দেয় আরও একটি আলোর ঝিলিক। অনুপ্রিয়া। অনু এখন ক্লাস ওয়ানে। রুদ্রপ্রিয়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। ঘনশ্যাম বলছিলেন, অল্টোটা বদলে গত বছর হুন্ডাই কিনেছেন। বাড়িটা এখন তিন তলা। কর্পোরেট ক্লায়েন্ট ধরতে প্রপ্রাইটারশিপ ফার্ম থেকে প্রাইভেট লিমিটেড করার প্রয়োজন পরে। ২০১৪ সালে খুলে ফেলেন প্রধান রিলোকেশন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। রিলোকেশন বলতে বোঝায় কোনও ব্যক্তি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হবেন, তখন তাঁর যাবতীয় সংসার কিভাবে নিয়ে যাবেন অন্য জায়গায় সেই সমস্যার সলিউশনটাই দেয় প্রধান। পাশাপাশি শিল্পের সামগ্রী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজটাও করে ওর সংস্থা। কথায় কথায় বেরিয়ে এল ওর ব্যবসার পরিধির কথা। এখন ওর সংস্থার টার্নওভার প্রায় দেড় কোটি টাকা। ক্লায়েন্টের তালিকায় আছে আইডিয়া সেলুলার, টাটা টেলিকম, টাটা টেলে সার্ভিস, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, ইউবি স্পিরিটস, ইয়ামাহার মত সংস্থা। শুধু তাই নয় জাহাজে ক্যাপ্টেনের কেবিন প্রস্ততকারক সংস্থা প্যাগোডা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট পাঠানোর কাজও করে থাকে ঘনশ্যাম বাবুর প্রধান রিলোকেশন প্রাইভেট লিমিটেড। আগামী পাঁচ ছ বছরে প্রায় দশ কোটির টার্নওভার ছুঁয়ে ফেলতে চান এই লড়াকু উদ্যোগপতি। আরও মনোনিবেশ করতে চান আমদানি রফতানি সংক্রান্ত কাজে। কমার্শিয়াল ট্রান্সপোর্টেশনের কাজ আরও বেশি করে করতে চান। আর চান আরও বেশি সংখ্যক কর্পোরেট ক্লায়েন্ট। ওড়িশায় শাখা খুলেছেন। কলকাতায় হেড অফিস। এখন জনা কুড়ি মানুষের কর্ম সংস্থান করেছেন ঘনশ্যামবাবু। ব্যবসাটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি চাইছেন কর্মী সংখ্যাটাও আরও বাড়ুক।

ঘনশ্যাম প্রধান, এখন মেদিনীপুরের সাজেলপুর গ্রামের বাড়ি গেলে উৎসব হয়। গর্বিত দাদারা নানান বিষয় নিয়ে পরামর্শ চান। গ্রামের লোকেরা যারা ভেবেছিল ছেলেটা বোধ হয় গোল্লায় গেল এখন তাদের চক্ষু ছানাবড়া।

ক্রেডিটঃ  YourStory

Use Facebook to Comment on this Post