যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বয়সন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের অধিকার

মানুষের রোমান্স ও যৌনক্রিয়া সম্পর্কের মধ্যেও মানবাধিকার বিষয়টি জড়িত। আমরা কার সাথে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক, যৌন সম্পর্ক এবং সন্তান ধারণ সম্পর্কিত সম্পর্ক গড়ে তুলব সেটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দের সাথে জড়িত এবং

সেটা তখনই সম্ভব যখন আমার অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলো সংরক্ষিত হয় যৌন সম্পর্ক এবং প্রজনন বিষয়ের সাথে যখন মানবাধিকার বিষয়টি সম্পর্কিত করা হয় তখন সেটাকে বলা হয় যৌন অধিকার বা প্রজনন অধিকার। যৌন অধিকার এবং প্রজনন অধিকার বিষয় দুটি আন্তঃসম্পর্কিত এবং এর সাথে সম্পর্কিত অধিকারগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার আসলে আমাদের সকলের জন্যই প্রযোজ্য। এটি এমন একটি অধিকার যার মাধ্যমে আমরা কোন ধরণের বৈষম্য, জবরদস্তি অথবা সহিংসতা ছাড়াই প্রজনন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারি। এ ধরণের সুযোগ আমাদের নিজ নিজ প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করেন। যেমন- সন্তান নেয়া ও সে সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা। পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্য প্রাপ্তি ও পছন্দ মাফিক পদ্ধতি গ্রহণের অধিকার, গর্ভাবস্থা এবং সন্তান জন্মদান সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির স্বাধীনতা/অধিকার। কোন রকম হয়রানী, বৈষম্য, জবরদস্তি ছাড়াই প্রজনন সংক্রান্ত যে কোন ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার অধিকার।

প্রজনন অধিকারের মত যৌন অধিকারও একটি মানবাধিকার। আমাদের সকলের এ অধিকার রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা মুক্তভাবে এবং ইচ্ছামাফিক যৌন সম্পর্ক গড়তে পারি। কেবল মাত্র সন্তান উৎপাদনের জন্য নয়, বরং আমাদের উচিৎ আনন্দময় জীবন-যাপনের জন্য যৌন অভিজ্ঞতা অর্জন করা। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে, “প্রত্যেকটি শিশুরই জ্ঞান ও তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। জ্ঞান ও তথ্য শিশুকে নিরাপত্তাহীনতা থেকে রক্ষা করে এবং মানুষের সকল গুনাবলীসহ সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করে।”

সমাজের অন্যান্যদের মত কিশোর-কিশোরী বা তরুন-তরুনীদেরও প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্যসেবা একটি অধিকার। কিশোর-কিশোরী বা তরুন-তরুনীদের নিকট তাদের প্রজনন ও যৌন অধিকারগুলো প্রয়োগ করা অত্যন্ত জটিল। এর বেশ কিছু কারণও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তরুন-তরুনীদের এ ব্যাপারে এত বেশী সক্রিয় হওয়ার দরকার নেই। আবার অনেক সময় চিকিৎসকেরা অভিভাবককে সাথে আনতে বলেন বলে তরুন-তরুনীরা এসংক্রান্ত সেবা গ্রহণে হয় না। অনেক সময় তরুন-তরুনীদের এ সব বিষয়ে জানার আগ্রহকে অনৈতিক হিসেবে ভাবা হয় এবং এই ধরণের সংস্কৃতি তাদেরকে তথ্য জানার উৎসগুলো হতে দুরে রাখে। অসম ক্ষমতার কারণে তরুন-তরুনীরা তাদের প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যা জানার আগ্রহকে দমিয়ে রাখে এবং এ ব্যাপারে তারা নিজের পছন্দমত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

আমাদের সমাজের বাল্যবিবাহ বা বিয়ে প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বয়সে উপনীত হওয়ার পূর্বে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সাথে বয়সের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ কারণ, বিবাহিত জীবনকে গ্রহণ ও মুখোমুখি হওয়ার জন্য নারী-পুরুষের মানসিক ও শারীরিক পরিপক্কতা অর্জন অপরিহার্য। অপরিণত বয়সে বৈবাহিক জীবনের বিপর্যয় সম্পর্কে জানা থাকে না। যেমন, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, অল্প বয়সী মা ও শিশু মৃত্যুর কারণ গর্ভধারণের জন্য মার যে শারীরিক প্রস্তুতি বা জরায়ুর যে পূর্ণ বিকাশ দরকার, তা সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে সন্তান ধারণের মাধ্যমে বিপদ ডেকে আনা হয়। অজ্ঞতার কারণেই কিশোর-কিশোরীদের এ ধরণের অর্থাৎ সঠিক জীবন-যাপনের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। যৌন শিক্ষা এ অজ্ঞনতা দুর করতে পারে বলে মনে করেন, প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ।

বস্তুতঃ মানুষ তার প্রজনন ও যৌন অধিকারগুলো প্রয়োগে বিভিন্ন ধরণের বাঁধার সম্মুখীন হয়। দুর্ভাগ্য বশতঃ আমরা সেই বাঁধাগুলোকে দুর না করে এড়িয়ে যাই এবং আমাদের সংস্কৃতির এটাই স্বাভাবিক নিয়ম বলে মনে করি এবং মেনে নেই। মানবাধিকার রক্ষা এবং পূরণ সরকারের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। বিভিন্ন দেশ, বিভিন্নভাবে এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব অন্যদের মানবাধিকারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। যৌন শিক্ষার অভাবে আমাদের দেশে প্রজনন ও যৌন অধিকার গুলো বিভিন্ন ভাবেই লংঘন হয়ে থাকে। যেমন- একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। তরুন-তরুনীদের স্কুলে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা না দেয়া। ১৮ বছরের আগেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়া।

শিশু যৌন নিপীড়ন একটি অপরাধ হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের দেশে শিশু যৌন নিপীড়নের প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই। এমনকি শিশুরা তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের কথা প্রকাশ করতে পারে না এবং অনেক ক্ষেত্রে তার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে সেটাও সে বুঝতে পারে না। সামাজিক নিরাবতা ও অজ্ঞতার কারণে এভাবেই প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে শিশু নির্যাতন। বন্ধ হচ্ছে বাল্য বিবাহ ও যৌন হয়রানী। এজন্য বয়সন্ধিকালে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বিশেষ করে, প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানা খুবই জরুরী। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল তথ্য জানার অধিকারও রয়েছে কিশোর-কিশোরীদের। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক অধিকারগুলো হচ্ছে- প্রত্যেকের বাঁচার অধিকার, গর্ভজনিত কারণে কোন নারীর জীবন ঝুকিপূর্ণ না করা, প্রত্যেক নারী-পুরুষের স্বাধীন ও নিরাপদ যৌন জীবন উপভোগ করা ও প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার। যৌন প্রজনন জীবন সহ সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা, যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে গোপনীয়তা রক্ষা, যৌন প্রজনন বিষয়ে মুক্ত চিন্তা ও গবেষণা জানা ও শেখার অধিকার, পরিকল্পিত পরিবার গঠণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য লাভ, পছন্দসই নিরাপদ, আরামদায়ক, মর্যাদাপূর্ণ ও নিয়মিত সেবা প্রাপ্তির অধিকার। এ সকল অধিকার সম্পর্কে ধারণা থাকলে কিশোর-কিশোরীরা স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যতœ এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভাল স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি পরিকল্পিত জীবন গঠণের জন্য তৈরী হতে পারে। বয়সন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে অক্সফাম-এর অর্থায়নে গণসাক্ষরতা অভিযান, ব্র্যাক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস), হাসাব, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি (এফপিএবি) সহ কয়েকটি সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করছেন। সংস্থাগুলোর মতে যদি তরুন-তরুনীদের তাদের প্রজনন ও যৌন অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা যায় তবে তারা তাদের নিজদের প্রজনন ও যৌন সম্পর্কিত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে যা তাদেরকে যৌন নিপীড়ন হতে নিরাপদ রাখতে অপ্রত্যাশিত গর্ভবতী হতে নিরাপদ থাকতে এবং বিভিন্ন ধরণের সংক্রমন হতে রক্ষা করতে পারে।

লেখকঃ আব্দুল আজিজ, কিশোর অধিকার সচেতন কলামিস্ট।

Use Facebook to Comment on this Post