শাফায়াতের তিনশ টাকার মাইক্রোস্কোপ | ইশতি আহমেদ

শুরুর গল্প

শুরুটি হয়েছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই। পৃথিবীর মাঝে বেড়ে উঠতে উঠতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হতেন শাফায়াত আজাদ। দেখতে চাইতেন, ওইখানে কী আছে। জানতে চাইতেন, মহাবিশ্বের অজানা রহস্যগুলো। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বড় মামা। ধরে ধরে শাফায়াতকে আকাশের তারাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। আকাশের প্রতি শাফায়াতের ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়, যখন হাতে পান হুমায়ুন আজাদের ‘মহাবিশ্ব’ বইটি। এ ছাড়া মহাকাশ বার্তারও নিয়মিত পাঠক ছিলেন। আকাশের মানচিত্র আর গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞানলাভ করে ফেলেন তিনি। কিন্তু তাতে কি আর আঁশ মেটে? শাফায়াত চাইতেন, আর একটু কাছ থেকে আকাশ দেখতে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন টেলিস্কোপ। কে দেবে তাঁকে সেটি?

একটি টেলিস্কোপ জোগাড় করতে কম কষ্ট করেননি তিনি। অত দামি জিনিস নিজের টাকায় কেনা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। তার পরও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বিভিন্ন বিজ্ঞান ক্লাব থেকে আশ্বাস পেয়েও টেলিস্কোপ আর হাতে নিতে পারেননি তিনি। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজেই তৈরি করে ফেলবেন একটি টেলিস্কোপ।

এনটিভি অনলাইনের অফিসে বসে শাফায়াত জানান, কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাঁর এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। ২০০৭ সালে হঠাৎ বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে চাকরি করে। সেই চাকরির মাইনে থেকে কিছু টাকা জমিয়ে তিনি শখের মূল্য দিতেন টেলিস্কোপ তৈরির বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে আর গবেষণা করে। কিন্তু টেলিস্কোপ বানাবেন কীভাবে? নিউমার্কেট-নীলক্ষেত তন্নতন্ন করে একটি বই পাওয়া গেল না। প্রথম দিকে টেলিস্কোপ বানানোর কৌশল রপ্ত করতে তিনি পুরোপুরি নির্ভর ছিলেন গুগল আর ইন্টারনেটের ওপর। কিন্তু তাও খুব বেশি কাজের ছিল না। আশপাশের বেশ কিছু মানুষও তাঁকে সাহায্য করেছেন অবশ্য। এর মাঝে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি এফ আর সরকারের নাম উল্লেখযোগ্য।

টেলিস্কোপ তৈরি করলেন যেভাবে

২০০৮ সাল থেকে মোটামুটি বেশ দৃঢ়ভাবে চেষ্টা শুরু করলেন টেলিস্কোপ তৈরির। প্রথম দিকে তেমন কিছুই জানতেন না। ভুল থেকে শিখতে শিখতে কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। হঠাৎ মুখোমুখি হন এক বড় বাধার। টেলিস্কোপ তৈরি করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস লেন্সই যে নেই! এমনকি এ দেশের কোথাও এই জিনিস নেই। দেশের বাইরে থেকে আনতে গেলে যে পরিমাণ টাকা লাগবে, তা ব্যয় করাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তবে তাঁকে থেমে থাকতে হয়নি। এবার হাত বাড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত এক বড় ভাই। দুবাই থেকে ছয়টি লেন্স এনে দিয়ে শাফায়াতের মুখে হাসি ফোটালেন তিনি। শাফায়াতও চালিয়ে গেলেন তাঁর প্রচেষ্টা। ২০১১ সালে মোটামুটি মানের একটা টেলিস্কোপও তৈরি হয়ে গেল। তবে একেবারে নির্ভেজাল, উন্নতমানের টেলিস্কোপ তিনি করলেন ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে। ছোটবেলার স্বপ্ন আর বহুদিনের কঠোর শ্রম এবার আলোর মুখ দেখল।

এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এই তিন বছরের মাঝেই তৈরি করে ফেলেছেন চার শতাধিক টেলিস্কোপ। তাঁর মতো যাঁরা আকাশ দেখার সাধ মেটাতে পারতেন না টেলিস্কোপের অভাবে, তাঁরাই আজ শাফায়াতের তৈরি কম দামি টেলিস্কোপ সংগ্রহ করছেন। শাফায়াত জানান, তিনি অনেক ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারেন। সেগুলোর দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে শুরু করে রয়েছে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি মহাকাশ গবেষণা করার জন্য শক্তিশালী টেলিস্কোপ তৈরির কৌশলও তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন। বাইরে তৈরি এই টেলিস্কোপগুলো কিনতে গেলে লাগবে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখের ওপর। এক একটি টেলিস্কোপ তৈরি করতে তাঁর এক থেকে দুদিন সময় লাগে। তবে বড়গুলো তৈরি করতে মাঝেমধ্যে ২০-২৫ দিনের মতোও সময় লেগে যায়।

ক্রেতা কারা?

কারা কেনে এই টেলিস্কোপ? শাফায়াত বলেন, আমাদের দেশে এখনো শৌখিন মানুষই জিনিসগুলো ক্রয় করে থাকে। ও রকমভাবে গবেষণা করার মতো মানুষ দেশে এখনো তৈরি হয়নি। তবে মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের। শাফায়াত জানান, তাঁর থেকে সবচেয়ে বেশি টেলিস্কোপ কেনেন ডাক্তাররা। এর পর আছে ছাত্র, প্রকৌশলী, ব্যাংকার থেকে শুরু করে শিল্পপতিরা।

শুধুই কি টেলিস্কোপ?

শুধু টেলিস্কোপ তৈরি করেই থেমে থাকেনি শাফায়াতের এই পথচলা। টেলিস্কোপ তৈরি করার সময় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি লক্ষ করেন, তাঁর পক্ষে সম্ভব আরো দরকারি কিছু জিনিস তৈরি করা। একে একে তিনি তৈরি করে ফেললেন কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ, মনোকুলার,  মোবাইল ফোন এক্সট্রা মাইক্রোলেন্স, বায়োলজিক্যাল গ্যাস মাস্ক, ফায়ার প্রুফ ক্লথ, লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপক কার্বন ডাইঅক্সাইড সিলিন্ডার, স্নাইপার স্কোপ, বাইনোকুলার, ক্লাসরুম প্রজেক্টর, ক্লাসরুম প্লেনেটোরিয়ামের মতোও চমৎকার সব জিনিস।

তিনশ টাকায় মাইক্রোস্কোপ!

তাঁর হাতে দেখা গেল ছোট একটি মাইক্রোস্কোপ। শাফায়াত জানান, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যবহারিক শিক্ষা নিতে পারছে না। তাঁর হাতের সাধারণ মাইক্রোস্কোপে এলইডি বাতি, সুইচ, ব্যাটারি ও বাতির আলোকে রেগুলেট করার জন্য সার্কিট ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে আলোর স্বল্পতার সময়ও এই মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কাজ করা যায়। এ রকম শক্তিশালী একটি মাইক্রোস্কোপ বাজারে কিনতে গেলে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ করতে হবে। আর শাফায়াত তা বিক্রি করছেন মাত্র ৩০০ টাকায়! চাইলে বাংলাদেশের অনেক স্কুল শিক্ষার্থী গবেষণা কাজের জন্য এই স্বল্পমূল্যের মাইক্রোস্কোপ কিনতে পারে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব স্কুল অর্থাভাবে মাইক্রোস্কোপ কিনতে পারে না, অনেক শিক্ষার্থী মিলে একটি মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে, তারা শাফায়াতের মাইক্রোস্কোপ কিনতে পারবেন অনেক কম দামে।

আরো কত কী

মাইক্রোস্কোপ ছাড়াও শাফায়াত তৈরি করেছেন বিদ্যুৎ ছাড়াই চলতে সক্ষম ক্লাসরুম প্রজেক্টর, যা কিনতে লাগবে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এ ছাড়া আরো তৈরি করেছেন ক্লাসরুম প্লেনেটোরিয়াম, যার দাম মাত্র ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ বাজার থেকে এটি ক্রয় করতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হবে। এ ছাড়া আছে তাঁর তৈরি করা একটি পরিপূর্ণ ল্যাবরেটরি কিট। সে কিটে নবম-দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর উপযোগী সব ব্যবহারিক উপকরণ রয়েছে। খরচ মাত্র ২০ হাজার টাকা। শাফায়াত জানান, বাংলাদেশের অনেক স্কুলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ল্যাব কিংবা ক্লাসরুম নেই। সেসব স্কুলের আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখেই অল্প টাকার এসব আধুনিক জিনিসপত্র বানিয়েছেন তিনি।

শাফায়াত আলাপের ফাঁকে ছোট একটি মনোকুলার দেখান। দেখতে অনেকটাই ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারোর হাতের যন্ত্রটির মতো। মাত্র আড়াই হাজার টাকা দামের যন্ত্রটি দিয়ে দূরের জিনিস খুব সূক্ষ্মভাবে দেখা যায়। যাঁরা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য চমৎকার একটি সঙ্গী হতে পারে এই যন্ত্র।

আগুনে ‘ফায়ার প্রুফ ক্লথ’

আমাদের দেশে ঘনঘন আগুন লাগে। আগুন থেকে রক্ষা পেতে তিনি তৈরি করেছেন ফায়ার প্রুফ ক্লথ। সেটি পরে ১০-১২ মিনিট আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো ক্ষতি হবে না। প্রান্তিক অঞ্চলের কৃষকদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন মোবাইলে ব্যবহারযোগ্য বিশেষ অণুবীক্ষণ যন্ত্র।

এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজে লাগে এ রকম বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও তিনি তৈরির পর বিক্রি করছেন অনেক কম দামে। টেলিস্কোপ কিংবা ক্যামেরার জন্য ব্যবহার করা যাবে, এ রকম ট্রাইপড তিনি বিক্রি করেন মাত্র ৭০০ টাকায়। এ রকম ট্রাইপড বাজার থেকে কিনতে লাগে তিন-চার হাজার টাকা। তিনি সম্প্রতি তৈরি করেছেন মোবাইল ফোনের ক্যামেরা লেন্স, যার দাম মাত্র ১ হাজার টাকা।

আর কেউ এসব জিনিস কেন তৈরি করছে না—জিজ্ঞেস করলে শাফায়াত উত্তর দেন, ‘সব বিনিয়োগকারী খুব দ্রুত লাভ খোঁজে। কিন্তু এ জায়গায় বিনিয়োগ করে দ্রুত লাভ পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। আমি পড়ে আছি একান্তই ভালোবাসার টানে। অনেকে আমার সঙ্গে পার্টনারশিপে আসতে চায়, কিন্তু আমি ফিরিয়ে দিই। বড় বিনিয়োগকারীরা হয়তো দ্রুত লাভের আশায় এই জিনিসগুলোর দামই অনেক বাড়িয়ে দেবে। তাহলে আমি যাদের উদ্দেশ করে যন্ত্রগুলো বানাচ্ছি, তাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। আমি চাই না কখনোই তা হোক।’

তবে তিনি দুঃখ করে বলেন, যাদের প্রয়োজনের কথা ভেবে তিনি জিনিসগুলো তৈরি করেন, তাদের খুব একটা আগ্রহ তিনি দেখতে পান না। বরং সুবিধাসমৃদ্ধ মানুষরাই বেশি আগ্রহী তাঁর উদ্ভাবনে।

বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা

শাফায়াত যে শুধু একজন উদ্ভাবক তা নয়, তিনি এ দেশের একজন জ্যোতির্বিদও বটে। জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে অসংখ্য কর্মশালায় তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। জাতীয় অ্যাস্ট্রো অলিম্পিয়াডের আয়োজক দলের একজন সদস্যও ছিলেন তিনি। বর্তমানে বিভিন্ন বিজ্ঞান মেলায় বিচারক হিসেবে ঘুরে ঘুরে খুদে বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলো দেখেন।

শাফায়াত বলেন, ‘মানুষের নিজের প্রয়োজনেই মহাকাশ কিংবা জ্যোতির্জগৎ নিয়ে জানতে হবে। আমরা এর মাঝেই বাস করি। আজকে মহাকাশে বিশাল কিছু ঘটে গেলে তার মুখোমুখি আমাদেরও হতে হবে। এটি সত্য যে আমাদের দেশে ও রকমভাবে অ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে চর্চা হয় না। তবে একেবারে যে নেই, তাও নয়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি দেখে কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে মানুষ এখন জানছে। কিন্তু একজন সত্যিকারের জ্যোতির্বিদ তৈরি করতে ছোটবেলা থেকেই তাকে ও রকম একটি পরিবেশে রাখতে হবে।’

শাফায়াত আফসোস করে বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক মেধাবী ছাত্র বাইরে জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করছে, চর্চা করছে। নাসায়ও কর্মরত আছেন অনেকে। আমরা কিন্তু চাইলে তাদের সংস্পর্শে আসতে পারি। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়ার মতো কেউ নেই আমাদের দেশে। অন্যদিকে আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারত বেশ এগিয়ে গেছে এই দিক থেকে। কয়েক বছর আগেও তাদের দেশে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু এখন তারা মঙ্গলে নভোযান পাঠানোর মতো দৃঢ়তা দেখিয়েছে। আমরা যদি এখন থেকে শুরু করি, আমাদের দেশেও বেশ ভালো কিছু করা সম্ভব।’

শাফায়াত স্বপ্ন দেখেন, এই দেশের মানুষ একদিন জ্যোতির্বিদ্যা থেকে শুরু করে প্রযুক্তির সব দিকে এগিয়ে যাবে। যন্ত্রপাতির অভাবে কারো গবেষণা কিংবা পড়াশোনা আটকে থাকবে না। এই স্বপ্নকে ধারণ করে নিজের মেধা ও শ্রম কাজে লাগিয়ে শাফায়াত আরো সামনে এগিয়ে যেতে চান। তরুণ এই উদ্ভাবক চান, বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা যেন ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।

Use Facebook to Comment on this Post