ভার্চুয়াল ডাক্তার

‘ভার্চুয়াল ডাক্তার’ কথাটি শুনলেই আমাদের প্রথম যে কথাটি মাথায় আসে তা হলো ডাক্তার আবার ভার্চুয়াল হয় কি করে। ডাক্তার স্বয়ং উপস্থিত থেকেই না রোগীর চিকিৎসা করে। কিন্তু না এই প্রযুক্তির যুগে স্বয়ং উপস্থিত না থেকেও অনেক সময় রোগীর চিকিৎসা করা যায়। আর এমনটিই করলেন যুক্তরাজ্যের কিছু চিকিৎসক। তারা স্বয়ং উপস্থিত না থেকেও ভলান্টারি টিম গঠনের মাধ্যমে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন জাম্বিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর এইভাবে ভার্চুয়াল চিকিৎসক দল গঠনের পেছনে যে মানুষের সবচেয়ে বড় অবদান সে হলেন বিট্রিশ নাগরিক হু জোনস। তিনি জাম্বিয়ায় নিযুক্ত একজন সাফারি গাইড। বনে বনে ঘুরে পশুপাখি দেখাশোনা করাই যার কাজ। তাহলে এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে যার কাজ পশুপাখির সেবা করা তার মাথায় হঠাৎ মানুষকে সেবা দেয়ার পরিকল্পনা এলো কিভাবে।

ঘটনাটির শুরু ঠিক এভাবে। একদিন হু বন থেকে বেরিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি রাস্তায় দেখতে পেলেন রক্ত পরে আছে। রক্ত এমনভাবে পড়ে আছে তিনি দেখে ভাবলেন কোন সিংহ নিশ্চয়ই কোন কিছু শিকার করে টেনে নিয়ে গেছে। আর তা দেখার জন্য রক্তের সূত্র ধরে হাঁটতে লাগলেন। সামনে এগিয়ে দেখলেন এক ভদ্রলোক তার মোটরবাইক থামিয়ে রাস্তার পাশে তার স্ত্রীকে নিয়ে বসে আছে। হু দেখে ভাবলেন তারা মনে হয় দুর্ঘটনার শিকার। কাছে গিয়ে সাহায্য করতেই হু দেখলেন যে না তাদের কোন দুর্ঘটনা হয়নি। ভদ্রলোকের স্ত্রী প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করছে এবং রাস্তার মাঝেই তার সন্তান হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কারণ হাসপাতালের রাস্তা গ্রাম থেকে ৬০ কি.মি দূরে। আর গ্রামের রাস্তা একটিও পাকা না ফলে ঝাকুনিতে লোকটির স্ত্রীর এই অবস্থা। এরপর হু তাকে সাহায্য করে হাসপাতালে পৌছে দিয়ে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাচ্চাটিকে বাঁচানো সম্ভব হলো না।

হু জোনস

সেদিনের ঘটনাটি হু এর মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। সে সর্বক্ষণ ভাবতে থাকতো সেতো সবে একজন মানুষের দুর্ভোগ দেখলো জাম্বিয়ার ওই গ্রামে এমন আরো অনেক মানুষ আছে যারা প্রতিনিয়ত এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। জাম্বিয়া হলো ১৪ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশ আর সেখানে ডাক্তার আছে মাত্র একহাজার ছয়’শ জন। প্রয়োজনের তুলনায় যা একবারেই কম তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। আর এর মধ্যেও বেশিরভাগ ডাক্তার গ্রামের চেয়ে শহরের কাজ করতে বেশি ভালোবাসেন। গ্রামে একটি মাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আছে যেখানে রোগীর গাদাগাদি লেগেই থাকে এবং যা গ্রাম থেকে অনেক দূরে। অনেক শিশু সুষ্ঠু চিকিৎসা এবং সময়মতো পৌঁছাতে না পারার কারণে মৃত্যুবরণ করে।

এমন অবস্থায় নিজেকে আর থামিয়ে রাখতে পারলেন না হু। নিজ উদ্যেগে যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যেয়ে কথা বললেন। তারা হুকে সাহায্য করার জন্য সেখানে চিকিৎসকের প্রতিনিধি একটি দল পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। তারা জাম্বিয়ার ১৯ টি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভার্চুয়াল চিকিৎসক দল পাঠিয়ে সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা দিত। ম্যালেরিয়া, যক্ষা এইচআইভি এবং গর্ভস্থকালীন বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিত তারা। তাদের এই উদ্যেগে জাম্বিয়ার দুটি জেলার চিকিৎসকরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাজ্য থেকে আসা প্রতিনিধি দলটি জাম্বিয়া রোগীদের সবরকম নমুনা ইমেইলের সাহায্যে যুক্তরাজ্যে পাঠালে সেখান থেকে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ঔষধপত্রের তালিকা লিখে দেয়।

তবে জাম্বিয়াতে চর্মরোগের সমস্যা এবং এইডস রোগীর সংখ্যাই বেশি। কিন্তু এত কিছুর পরেও যেন কিছু অপূর্ণতা থেকেই যায়। ব্রিটিশ চিকিৎসকরা ভার্চুয়ালই জাম্বিয়ার নাগরিকদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতির অপূর্ণতা থাকার কারণে কিছু চিকিৎসা অপূর্ণই থেকে যায়। যেমন কিছু পরীক্ষা আছে যার নমুনা পাঠিয়ে দিলে তার রিপোর্ট ইমেইল করে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব কিন্তু কিছু পরীক্ষা এমন আছে যেখানে রোগীর নিজের স্বয়ং উপস্থিত থাকতে হয়। যেমন এক্স-রে, এমআরই এগুলো পরীক্ষার জন্য রোগীর স্বয়ং উপস্থিতি দরকার। যদিও গ্রামের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে এক্স-রে মেশিন পাঠানো হয়েছে কিন্তু এমআরআই মেশিনের দাম ব্যয়বহুল হওয়ায় তা এখনও পাঠানো সম্ভব হয় নি।

তবে উন্নত প্রযুক্রি এবং মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের কারণে এখন অনেক কিছুই বেশ সহজ হয়ে গেছে। মানুষ এখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা আদান প্রদান করতে পারে। আর এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে বসে রোগী দেখেন ব্রিটিশ চিকিৎসকরা। কিন্তু হু মনে করেন এই ব্যবস্থা এবং তার এই পরিকল্পনা আরও প্রসারিত করা সম্ভব যদি জাম্বিয়া সরকারের সদয় মনোভাব থাকে। জাম্বিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী হুএর এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে। তিনি মনে করেন জাম্বিয়া ও যুক্তরাজ্য এক হয়ে কাজ করলে অপূর্ণ থাকা সমস্যাগুলোও সমাধান সম্ভব। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত জাম্বিয়ার হাই কমিশনার এই উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো মজবুত করবে বলে মনে করেছেন। তিনি বলেন, ‘মানবতাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম।’

Use Facebook to Comment on this Post