খেলনা বন্দুক আর না!

* ১১ অক্টোবর রাজধানীর শান্তিনগরের একটি বাসায় বেড়াতে এসে গুলিবিদ্ধ হয় ৯ বছর বয়সি জান্নাত। ১০ বছর বয়েসী ফুফাতো ভাই মাহি তার বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে গুলি করলে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত জান্নাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাসায় ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করার সময় মাহির ছোঁড়া পিস্তলের গুলিতে আহত হয় জান্নাত।
সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১২ অক্টোবর ২০১৪

* ১৭ মার্চ বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলায় পিস্তল দিয়ে খেলা করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ৪ বছর বয়সি প্রীতি ইজারাদার। তার চাচা বালিশের কাছে পিস্তল রেখে ঘুমালে ভোরবেলা সবার অজান্তে প্রীতি পিস্তল নিয়ে খেলা করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
সূত্র : দৈনিক মানবজমিন, ১৮ মার্চ ২০১৪

* ১০ নভেম্বর জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মিরচর ইউনিয়নের বারুয়ামারি গ্রামে ফাঁসি খেলতে গিয়ে অনিক নামের ৭ বছর বয়সি এক শিশু মারা যায়। বাড়ির পিছনে ঘরের চালার সঙ্গে কয়েকজনের সঙ্গে ফাঁসি খেলতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে।
সুত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ১২ নভেম্বর ২০১৪

* ২৯ আগস্ট রাজবাড়ির গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের দুদুখান পাড়া গ্রামে ফাঁসি খেলতে গিয়ে মারা যায় ১০ বছর বয়সি ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র রাকিব। ছোট ভাইকে নিয়ে সন্ধ্যায় ফাঁসি খেলার সময় ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে মারা যায় সে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ আগস্ট ২০১৪

উপরের ঘটনাগুলো উদাহরণ মাত্র। প্রাণহানি না ঘটলে বাংলাদেশে এ ধরনের বেশিরভাগ ঘটনাই সংবাদ মাধ্যমে আসে না। যার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনার খবরগুলো আমাদের সকলের অগোচরেই থেকে যায়। ফলে অধিকাংশ সময়ই বাচ্চাদের খেলাসংক্রান্ত ভয়াবহ বিপত্তিগুলোর কথা আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা।

কিন্তু ভাবুন তো, যদি একবার আমাদের পরিবারের কারো জীবনে এধরনের ঘটনা ঘটে তার ক্ষতটা কি সারাজীবনেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব? এ ধরণের সামান্য একটি ভুলের মাশুল দিতে হতে পারে পুরোটা জীবন ধরে।

প্রশ্ন উঠেতই পারে এ ধরণের দুর্ঘটনা এড়ানোর উপায় কী? তাহলে বাচ্চাদের খেলাধুলা কি বন্ধ করে দিতে হবে!

আসলে সমস্যাটা বাচ্চাদের খেলায় নয়। সমস্যার উৎপত্তি খেলনা এবং খেলার পদ্ধতিতে। প্রথম দুটি ঘটনার কথাই ধরুণ, দুটি শিশুই পিস্তলের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। তার মানে এইসব শিশুরা পিস্তল দিয়ে খেলতে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে শুধু তারা আসল নকলের পার্থক্যটা বুঝতে পারেনি। আর পরের দুটি ঘটনায় শিশুদের খেলার পদ্ধতিটাই ছিলো বিপদজনক।

অধিকাংশ অভিভাবকই বিভিন্ন প্রাণঘাতী অস্ত্রের রেপ্লিকাকে খেলনা মনে করে তুলে দেন বাচ্চাদের হাতে। তাদের ধারণা প্লাস্টিকের পিস্তল, তলোয়ার, রকেট লাঞ্চার বা সামান্য জলকামানে বাচ্চার এমন কীই বা ক্ষতি হতে পারে?

কিন্তু এমন ভাবাটা মোটেই ঠিক নয় বলে জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক মেহজাবিন হক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চ্যাম্পস টোয়েন্টিওয়ান ডটকমকে তিনি বলেন, ‘খেলার মাধ্যমে একটি শিশু শেখে সে কীভাবে পরবর্তী জীবনে চলবে। তার একটা মহড়াও চলে শিশু বয়স থেকেই।

যেমন অনেক শিশু পাইলট-পাইলট খেলা, স্কুল শিক্ষক-ছাত্র খেলা, চোর-পুলিশ খেলাসহ অনেক রকম খেলা খেলে। যার প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী জীবনে। কারণ এসব খেলার মাধ্যমেই তার আগামী জীবনের আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ পায়। আর ঠিক এ কারণেই অস্ত্র কখনো খেলনা হতে পারে না। তা সে প্লাস্টিকের হোক বা অন্য কিছুর তৈরি।

এ সময় তিনি উল্টো প্রশ্ন রেখে অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, অস্ত্রকে খেলনা হিসেবে শিশুর হাতে তুলে দিয়ে আমি আমার বাচ্চাকে কী শেখাচ্ছি? ও তো বড় হয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে হাইজ্যাক করাই শিখবে।

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। খেলনা অস্ত্র হাতে পেলে শিশুরা টেলিভিশনে দেখা পুলিশ-সন্ত্রাসীর ভূমিকাতেই খেলা শুরু করে। তারা খেলার সময় টেলিভিশনে দেখা পুলিশ-সন্ত্রাসীর মতই কল্পনার গুলি ছোড়ে। অনেক সময় সেসব খেলনা পিস্তল বা রাইফেলে গুলির শব্দ না হলে তারা মুখ দিয়েই গুলির শব্দ করে।

এতে করে কিন্তু শিশু মনেই তৈরি হতে থাকে নানারকম কল্পনার ফানুস। কারো সঙ্গে ঝগড়া বা প্রিয় কাউকে ব্যাথা পেতে দেখেল দায়ী ব্যক্তির বিরুেদ্ধ প্রতিশোধের ছকও এঁকে ফেলে তারা। এরপর খেলনা অস্ত্র দিয়েই শুরু করে মহড়া; আমার, আপনার অজান্তেই।

এছাড়া আসল কিংবা নকল অস্ত্রের বাছবিচার না করে খেলতে গিয়ে বিপত্তি বাধানোর ঝুঁকিতো রয়েছই। আজকাল বাজারে আসল পিস্তল, রাইফেলের মতই দেখতে খেলনা পিস্তল, রাইফেল পাওয়া যায়। এগুলো খেলনা হিসেবে শিশুদের কিনে দিলে তারা আসল নকল অস্ত্রের পার্থক্য বুঝে উঠতে পারে না।

অনেক সময় হাতের কাছে পিস্তল পেলে বাছবিচার না করেই খেলার ছলে গুলি করতে পারে তারা। শান্তিনগরের মাহি ও জান্নাতের বেলায়ও এমনটাই ঘটেছে বলে মনে করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেহজাবিন হক। তিনি আরো বলেন, ‘শিশুদের খেলনা অস্ত্র কিনে দিয়ে নেগেটিভ বিষয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি আমরা। কেননা টেলিভিশন, গেমসসহ বিভিন্ন বিনোদন মাধ্যমে শিশুরা বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্রের নেতিবাচক ব্যবহারই বেশি দেখে।

যেমন সন্ত্রাসীরা অস্ত্র ঠেকিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে অথবা পুলিশ-সন্ত্রাসী গুলিবিনিময় করছে ইত্যাদি দৃশ্য। আবার ভিডিও গেমগুলোতে অপরাধী পুলিশ হত্যা করে পালাচ্ছে সেখানে সে অপরাধীর ভুমিকায় খেলছে। এতে করে নেতিবাচক অনেক কিছু শিখে ফেলছে তারা।’

এসব থেকে শিশুদের দূরে রাখার বিষয়ে কিছু পরামর্শও দেন তিনি :
০ শিশুদের খেলাধুলা করার জন্য এমনিতে কিছু সরঞ্জাম লাগে। তাই বাচ্চাকে খেলনা কিনে দেওয়ার সময় একটু বাছবিচার করুন। যেমন খেলনা বন্দুক, তলোয়ারের পরিবর্তে লেগো সেট, রুবিকস কিউব কিনে দিন।

০ বাচ্চাকে খেলনা পুতুল কিনে না দিয়ে ওকে নিজের খেলনা পুতুল নিজেই বানিয়ে নিতে উৎসাহিত করুন। এতে করে ওর সৃষ্টিশীলতা বাড়বে। প্রয়োজনে নিজের খেলনা নিজে বানিয়ে নিতে আপনি ওকে সাহায্য করতে পারেন। এটা করলে আপনার শিশুর সৃজনশীলতার চর্চা বাড়বে।

০ বাচ্চাকে আপনি যেভাকে গড়ে তুলবেন সেভাবেই গড়ে ওঠবে। তাই একটু সচেতনতার সঙ্গে ওর বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে খেয়াল রাখুন।

০ আপনার সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে বা কম্পিউটারে কী গেম খেলছে সে ব্যাপারে সবসময় খেয়াল রাখুন। এ ব্যাপারে ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো গল্প করুন।

০ আপনার বাচ্চা তার সঙ্গীদের সঙ্গে কোন বিপদজনক খেলায় মেতে উঠছে কী না সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। বিপদজনক খেলা খেললে তার কী ধরণের ক্ষতি হতে পারে তা তাকে বুঝিয়ে বলুন।

০ অনেক মা-বাবা আছেন বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় সময় দেয়ার ব্যাপারে উদাসীন। তাদের শিশুরা বেড়ে ওঠে কাজের মানুষের কাছে বা অন্য কারো কাছে। এটা না করে নিজের সন্তানকে যতোটা সম্ভব সময় দেয়ায় সচেষ্ট হোন।

০ বাজারে বাচ্চাদের জন্য অনেক সৃজনশীল খেলনা পাওয়া যায়। আপনাকে সেখান থেকে আপনার শিশুর জন্য কোনটি উপযুক্ত তা বাছাই করে নিতে হবে।

Use Facebook to Comment on this Post