একজন পাগলের দৃষ্টিতে ডিপ্রেশন: প্রলাপ-২ | উচ্ছাস তৌসিফ

দ্বিতীয় প্রলাপের আগে:
যারা প্রলাপ-১ পড়েন নি, একেবারে শেষে যে লিঙ্কটা দেওয়া আছে, সেটা থেকে পড়ে নিতে পারেন। আগোছালো লেখার মাথামুণ্ডু বোঝার জন্য শুরুর অংশটুকু হয়তো কিছুটা সাহায্যে আসতে পারে। আগেই বলেছি, এখানে লেখা সবকিছুই আমার ব্যক্তিগত মতামত। কাজেই, এসব জিনিস যে খুব কাজের জিনিস না, এই বেলা সেটা মনে হয় আবার মনে করিয়ে দেওয়া ভাল!
২.১) অতিরিক্ত বিশ্বাস: কাউকে বিশ্বাস করার আগে একটা ব্যাপার ভালমত মাথায় রাখা ভাল। যাকে আপনি বিশ্বাস করছেন, সে আসলেই বিশ্বাসের যোগ্য কিনা। এই জিনিসটা আপনি কিভাবে হিসাব করবেন আসলে? ওয়েল, বিশ্বাস পরিমাপ করার কোন অফিসিয়াল পদ্ধতি যে নাই, সেটা নিশ্চয়ই বলে দেওয়ার দরকার নাই। কিন্তু সেটা হিসাব করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিটা আমার হিসেবে খুব সহজ।
সিম্পলি নিজেকে প্রশ্ন করেন, নিজেকে আপনি যতটুকু বিশ্বাস করেন, যাকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন তাকে আপনি ততটুকু বিশ্বাস করতে পারেন কিনা। আপনাদের দুইজনের জীবন নিয়ে টানাটানি পড়লে যদি শুধু একজনের বেঁচে ফেরার অপশন থাকে, যাকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন, সে আপনার জন্য নিজেকে স্যাক্রিফাইস করতে পারবে কিনা।
যদি এই প্রশ্নের উত্তর “না” হয় কিংবা আপনার মনে সামান্য দ্বিধাও থাকে, দয়া করে এই মানুষটাকে বিশ্বাস করবেন না।
হ্যাঁ, বিশ্বাস মানে যদি এমন হয় যে, সহপাঠি কিছু টাকা চাইছে, ধার দিবেন কিনা কিংবা গার্লফ্রেন্ডকে কোথাও পৌঁছায়ে দিয়ে আসতে হবে এবং নিজে যাইতে পারতেছেন না কোন জরুরি কারণে, তখন পৌঁছায়ে দিয়ে আসতে বলবেন কিনা- এসব ছোটখাট ব্যাপারের উপর নির্ভর করে কাউকে বিশ্বাস করবেন কি করবেন না, এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না নেওয়া ভাল।
২.২) জেনারেল কনসেপশন:
বিশ্বাস নিয়ে সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা বলি। মানুষ খুব সামাজিক জীব। কাজেই, মোটামুটি ভাল সম্পর্ক আছে, দেখা হলে ভদ্রতা করে নিয়মিত হাই-হ্যালো বলেন কিংবা দুই-একবার প্রয়োজনে ক্লাস নোট আদান-প্রদান করেছেন- এমন কাউকে যদি সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন যে, “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস কর?”- এই প্রশ্নের উত্তরে বেশীরভাগ মানুষই না বলতে পারবে না। না বলাটা খুব সহজ ব্যাপার না।
কাজেই কেউ আপনাকে “আমি তোমাকে বিশ্বাস করি” টাইপের কিছু বললে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া ভাল।
এই ব্যাপারটা চাইলে মজা করার জন্যে পরীক্ষা করে দেখা যায়! খুব সিম্পল। দুই বন্ধু মিলে একই মানুষকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন বিশ্বাসের ব্যাপারটা। সপ্তাহখানেক সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে হাতে-কলমে ব্যাপারটা চেক করে দেখলে বেশ মজা পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা!
সরল কথায় ব্যাপারটা হল, কেউ আপনাকে বিশ্বাস করার কথা বলে বসলে আনন্দিত হওয়ার কোন কারণ নাই। বোঝা দরকার, তার উপর একটা চোখ রাখা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।
২.৩) তাহলে আমি কাউকে বিশ্বাস করলেও তাকে বলতে পারব না?
জীবন যেহেতু খুব সিরিয়াস ব্যাপার, কাজেই ছেলেমানুষি কিছু করার আগে ১০০১বার ভেবে নেওয়া ভাল। মানে হচ্ছে, এই ধরণের কথা কাউকে একেবারে না বলাই ভাল।
কাউকে যখন আপনি বিশ্বাস করবেন, এটা সে এমনিতেই বুঝবে।
দুইটা জিনিস, বিশ্বাস আর ভালবাসা- এগুলি এমনিতেই বুঝা যায়। কাউকে বলে বুঝাতে হলে সেটা আর যাই হোক বিশ্বাস বা ভালবাসার মধ্যে পড়ে না। আর এই দুটো জিনিস আসলে একটা আরেকটার পরিপূরক, হাত ধরেই থাকে।
একটা কথা মনে হয় বলে নেওয়া ভাল। কেউ যেন ভালবাসার কথা জানানো আর অফিসিয়ালি কাউকে প্রপোজ করাকে গুলিয়ে ফেলবেন না। আপনি কাউকে ভালবাসলে সে সেটা বুঝবে। প্রপোজ কেউ ভালবাসার জন্যে করে না। করে সম্পর্ককে অফিসিয়াল রূপ দেওয়ার জন্য। দুইটাকে একই জিনিস ভাবলে ভুল হবে।
২.৪) অতিরিক্ত বিশ্বাসের সমস্যাটা কী?
সমস্যা হচ্ছে, তখন আপনি বিশ্বাসের মানুষটার কাছে এক্সপেক্ট করতে থাকেন। মূল সমস্যা ওটাই, অতিরিক্ত আশা করা।
কাউকে যখন আপনি বলেন যে, আপনি তাকে বিশ্বাস করেন, তখন আপনি তাকে একটানে আপনার পার্সোনাল ব্যাপারে বেশ বড় ধরণের একটা অ্যাক্সেস দিয়ে দেন। যেটা ডিরেক্টলি আপনার পার্সোনালিটিকে তার কাছে নতুন করে ডিফাইন করে। কাজেই, কেউ সেটাকে ভালভাবে নিলে ভাল। সাধারণত মানুষ নিজেকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ভাবতে পছন্দ করে। কাজেই যাকে অ্যাক্সেস দিয়েছেন, সে এমনটা ভেবে নিতেই পারে যে, তার হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে আপনার উপর বিশেষ ধরণের দাবী করার অধিকার আছে! এবং সে আপনার উপর যেকোন ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতাটা ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তখনই সমস্যাটা শুরু হয়। এবং ঠিক এসব ক্ষেত্রেই আমরা মানুষকে বলতে শুনি যে, “আমি তাকে অনেক বিশ্বাস করতাম!” কিংবা “আমি তোরে ভাই ভাবছিলাম!” :p
কেউ যদি বলে, “আমাকে কি তুমি বিশ্বাস কর?”- এর উত্তরে কী বলা উচিৎ?
এই প্রশ্নের উত্তরটা হওয়া উচিৎ সহজ এবং স্পষ্ট। আমি আপনাকে বিশ্বাসও করি না, অবশ্বাসও করি না। আমি দর্শক, ঘটনা দেখছি। স্পেসিফিক কোন কথার ব্যাপারে বলা যায়, আমি অমুক কথাটা বিশ্বাস করেছি অথবা অমুক কথাটা বিশ্বাস করি নি। ব্যাস।
আমি আগেই বলেছি, যাকে আপনি নিজের মত করে বিশ্বাস করতে পারেন, তার কাছে স্বীকারোক্তি দিলেও সমস্যা নেই। তাকে আপনি বিশ্বাসের কথাটা বলতেই পারেন। কিন্তু যাকে নিজের মত বিশ্বাস করেন না, তার জন্যেই উপরের উত্তরটা, আমার মতে, আপনার জন্য বেটার।
২.৫) “না” বলা:
একটা জিনিস কি আমি স্পষ্ট করতে পেরেছি যে, প্রয়োজনের সময়ে কাউকে না বলতে পারাটা জরুরি? মানুষ সাধারণত “না” বলতে পারে না। কারণ এই কাজটা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের একটা। আজকাল বিলেতে বা পশ্চিমা দেশে ভদ্র ভাষায় না বলার রেওয়াজ চালু হয়েছে। আমাদের এদিকে এখনো চালু হয় নি। আমি সেই অর্থেই বলছি।
না বলা নিয়ে আরেকটা ব্যাপার হল, এটাও আপনার বোঝা দরকার কাকে কিভাবে না বলতে হবে। কাকে স্পষ্টভাবে বলবেন আর কাকে অস্পষ্টভাবে বললেও হবে, সেটা আপনাকে বুঝে নিতে হবে। জ্ঞানীদের জন্যে ইশারাই যথেষ্ট- এখানে জ্ঞানী মানে কিন্তু সক্রেটিস না। কমনসেন্স আছে এমন যে কারো জন্যেই এই কথা খাটে।
২.৬) তাহলে আসল কথাগুলি কী?
ক। নিজের মত বিশ্বাস না করতে পারলে কাউকে বিশ্বাস না করাই ভাল।
খ। কাউকে বিশ্বাস করলেও সেটা যেন অন্ধবিশ্বাস না হয়। এক চোখ খোলা রাখা ভাল এবং নিজের জাজমেন্টের উপর সেটার বিশেষ প্রভাব পরতে না দিয়ে লজিক ব্যবহার করা ভাল।
গ। কেউ বিশ্বাস করে বললেই সেটার উপর চট করে ভরসা করা কিংবা আশা না করা ভাল।
ঘ। প্রয়োজনে কাউকে না বলতে পারাটা জরুরি।
একটা জিনিস আবারো বলি। আশা যত কম, ধাক্কা তত কম খেতে হয়। ফলে ডিপ্রেশন খুব বেশী চড়ে বসতে পারে না।
এতক্ষণ যা বকবক করেছি, সবই আপনাদের জানা জিনিস। আমি শুধু বলতে চাই, এই জিনিসগুলি নিয়ে আরেকবার ভাববেন পারলে। প্রয়োজনে, পৃথিবী ওলোট-পালোট হয়ে গেলেও যেন এগুলি মাথায় থাকে- এই ব্যাপারটা একটু মাথায় গেঁথে নিলেই হয়।
এই পর্যায়ে এসে একটা কথা বলে নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি মোটেও বলছি না যে, আপনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারবেন না। আমি মোটেও সবার ব্যাপারে আপনাকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলতে চাইছি না। আমি শুধু বলছি, বিশ্বাস ব্যাপারটা খুব সস্তা জিনিস না। আমি বলতে চাইছি, ১০০১বার ভেবে নেওয়ার পরেই কেবল কাউকে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্তটুকু নেওয়া উচিৎ।
তারপর, আপনার যদি মনে মনে হয় কাউকে বিশ্বাস করা যেতে পারে, নিজেকে যতটুকু বিশ্বাস করেন ততটুকু কিংবা তারচেয়েও বেশী, তাহলে কোন সমস্যা নাই। কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতে হবেই, তাই না?
নিয়তির উপর কারো হাত নেই। কিন্তু আপনি কখন, কী ব্যাপারে আশা করবেন আর কোন জায়গায় আশা করবেন না- এটা আপনারই হাতে। নিজের নাটাই নিজের হাতেই রাখলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়- এটা মাথায় রাখলেই হয়।
কথাগুলি কি খুব ঢ়ুঢ় শোনাচ্ছে? আপনার ডিপ্রেশনের সমস্যা থাকলে আপনি তো জানেনই, পৃথিবী কখনো কখনো কী পরিমাণ নির্মম হতে পারে। এইটুকু মাথায় রাখলে কথাগুলি হয়ত অতটা ঢ়ুঢ় শোনাবে না।
(চলবে…)

Use Facebook to Comment on this Post