“ভ্রম” | উম্মে শারিকা

 

 

রাতুল চোখ মিটমিট করে সামনে তাকায়। এটা…. সেই বাড়ি না? অস্বস্তিতে মনটা ভরে উঠে। ভাগ্যের চাকা এভাবে ঝড়-বাদলের রাতে বিপদের দিনে তাকে এই বাড়ির সামনেই এনে ফেলল?

গুটিগুটি পায়ে এগোয় রাতুল। পুরো বাড়িটা কবরের মতো নিস্তব্ধ। আলো নেই, কোন মানুষও নেই। ধ্বংসের চিহ্ন যেন বাড়ির সর্বত্র। আর এই ধ্বংসের প্রায় সবটার জন্যই রাতুলই দায়ী।

অতীতের দিনগুলো একঝলক উঁকি দিয়ে যায় রাতুলের মনে। এই বাড়ির একমাত্র মিষ্টি মেয়েটার সাথে রাতুলের যখন বিয়ে হয়েছিল, সেটা ৫ বছর আগেকার কথা। সুখের স্বপ্ন নিয়ে বাঁধা ঘরটা যখন চুরচুর করে ভেঙে পড়তে থাকে, অসহায় মেয়েটার কিছুই করার ছিলনা। রাতুল তার উপর নির্মম অমানবিক অত্যাচার চালাতো, কখনো যৌতুকের জন্য, কখনো বা অকারণেই। পৈশাচিক অত্যাচারে মেয়েটা যখন মারা যায়, তারও ৪ বছর পার হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে পরিবারটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। মা ছিলনা ছোটবেলা থেকেই, আর মেয়ের বাবা এতবড় ধাক্কা সইতে পারেননি।

রাতুল এবাড়ির ধারেকাছে আর কখনো ঘেঁষেনি। বহুদিন পরে গ্রামে এসেছে ক’দিন আগে, একটা কাজে। আজকে দুর্যোগময় রাতটাতে এসে আটকে গিয়েছে এবাড়ির উঠানে। অসম্ভব বাজে আবহাওয়া, কারো চিহ্ন দেখা যাচ্ছেনা। একটা ঘরে উঁকি দেয় সে,কালিগোলা অন্ধকার ভেতরে। উপায় না পেলে এখানেই রাতটা কাটাতে হবে। পূর্বপ্রস্তুতি ছিলনা বলে আলোও নেই সাথে। ঘরটাতে ঢুকে যায় সে। বহুদিন পর যেন মানুষের প্রবেশ এ ঘরে। কিছুক্ষণ এলোমেলো পায়চারি করে অনুমানে একটা চেয়ারে বসে সে। খানিক পর উঠে গিয়ে খাটে শোয়। অচেনা ভীতিকর জায়গায় ঘুম আসতে চায়না। অন্ধকার…. কেবল অন্ধকার।

“দোহাই লাগে আমাকে আর মেরোনা, মরে যাব তো!!” ধড়মড় করে উঠে বসে রাতুল। দুঃস্বপ্ন দেখছিল, ঘামে ভিজে গেছে সারাশরীর। হাঁফ ছাড়তে যাবে তখন খেয়াল করে, ঝড় থেমে গেছে, পরিষ্কার চাঁদ উঠেছে। আর ঘরের চারটা বড় জানালা দিয়ে আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। আর তাতে যা দেখে, গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে তার। সারা ঘর জুড়ে কার যেন রক্তমাখা পায়ের ছাপে ভরা। চিৎকার করে নামে সে খাট থেকে, দরজার দিকে এগোয়। প্রায় কাছাকাছি যাবার পর তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে দরজা প্রচণ্ড আওয়াজে খুলে যায়। বাইরে থেকে এক কালো মূর্তি ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় ধমকে উঠে, “কে ওখানে?” মূর্তির মুখের দিকে চায় রাতুল এবং স্থবির হয়ে যায়। এটা তার শ্বশুরমশায়ের মুখ না? মৃত মানুষ কি ফিরে আসে?

প্রাণ হাতে করে দৌড়ে বেরোয় রাতুল। আর গিয়ে পৌঁছায় কবরখানার পাশে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ পড়ে তার স্ত্রীর কবরের দিকে। কে? কে ওখানে? সাদা শাড়ি পরা কে যেন বসা ওখানে। নারীমূর্তি তাকায় তার দিকে, মুখের ঘোমটা খুলতে শুরু করেছে!!!!! আর সহ্য করতে পারেনা রাতুল….. ভাবে.. নিশ্চয়ই স্ত্রীর মুখ দেখবে! কিছুই চিন্তা না করে পুকুরের দিকে ছুটে যায় সে। ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাঁতার না পারায় পাথরের মতোই টুপ করে ডুবে যায় কিছুক্ষণ পরই।

একদিন পর পত্রিকার পাতায় সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট:

বাদলপুর গ্রামে রাতুল(৩০) নামক এক যুবকের মৃত্যু। জানা যায়, ঘটনার দিন রাতে তিনি গ্রামের এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। মাঝরাতের পর একসময় পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লাশ শনাক্ত করেছেন ওই যুবকের মৃত শ্বশুরের ছোট ভাই আর তার স্ত্রী। তিনিই ওই বাড়ির বর্তমান মালিক যদিও তারা সেখানে থাকেন না। কিছুটা দূরে নিজেদের বাড়িতে থাকেন। অনিদ্রা থাকায় মাঝরাতে তিনি প্রায়ই এবাড়ির আশেপাশে এসে হাঁটেন। সেদিনও তাই করছিলেন এবং তার স্ত্রী তার ভাইয়ের মেয়ের কবর জিয়ারত করছিলেন। মেয়েটা তাদেরও খুব আদরের ছিল বলে সুযোগ পেলেই স্মৃতি জড়িয়ে রাখতে চান। সন্দেহজনক চিৎকার শুনে বাড়ির একটি ঘরে গিয়ে তিনি ওই যুবককে দেখতে পান। যুবক কোন কারণে তাকে দেখে ভয় পেয়ে যান এবং ঘর থেকে বেরিয়ে কবরখানার দিকে ছুটতে থাকেন। পরবর্তীতে কবরখানায় তার স্ত্রীকে দেখে সম্ভবত আরো ভয় পেয়ে যান। কিন্তু পুকুরে কেন ঝাঁপিয়ে পড়েন তা এখনো স্পষ্ট নয়।

উল্লেখ্য যে, যুবক সম্ভবত পাশের লালমাটির এলাকায় কোন কাজে গিয়েছিলেন। কেননা সারা ঘর জুড়ে তার নিজের লাল কাদামাখা পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।

 

– উম্মে শারিকা
চট্টগ্রাম কলেজ।

Use Facebook to Comment on this Post