শুদ্ধ-অশুদ্ধ | জগলুল আহমেদ

১.

বসে বসে ঘড়ির কাঁটার পদক্ষেপ অনুসরণ । নিতান্ত অলস ছাড়া কেউ এ ধরণের কাজ করে না । রমেশও করে না । আজ করছে । মানুষ খুব বেশি বড় হয়ে গেলে নাকি অতীত ভুলে যায় । রমেশ সেই খোঁয়ারের ভেড়া না । সে বড়ও হয় নি, আর স্মৃতিভ্রষ্টও হয় নি । অতীতগুলো বাঘের মতো আঁচড় বসিয়ে গেছে মনের দেয়ালে । রেখে গেছে গভীর ক্ষত । মাঝেমধ্যে বসে হাত বোলাতে হয় । লোকে বলে,ব্যথা ভুলে যাও; নয়তো সহজভাবে নাও । আর সহজভাবে নিতে হলে পালালে চলবে না, তার সম্মুখীন হতে হবে । জিনিসটা বলাটা অনেক সহজ । সেই গভীর ক্ষতগুলোতে হাত বোলানো যে কতটা যন্ত্রণার ,তা কেবল উপভোগকারীই বলতে পারে; অনুভব করতে পারে ।

তাই রমেশ সময় পেলেই আশরাফের সাথে একটু বসে । ধর্ষিতাই কেবল বোঝে ধর্ষণের বিষক্রিয়া । আশরাফও রমেশকে সময় দেয় । নিজে বইপত্র নিয়ে থেকে থেকে অসামাজিক জীব হয়ে উঠছিলো । এর মাঝেই পরিচয় রমেশের সাথে । ছেলেটা ভদ্র । দেখতে খানিকটা বিবর্ণ লাগলেও, চোখে কৌতূহল দাপাদাপি করে । বোধহয় তাই-ই চশমা পরে তাতে বাধ দেবার চেষ্টা করে । অবশ্য ছেলেটাকে ভালো লাগলেও, সাক্ষাৎটা মোটেও ভালো লাগে নি ওর । কারণ ওর চোখের চশমা ।

চশমিশ মানুষ দেখলে আশরাফের হয় মিশ্র অনুভূতি । ছোটবেলা থেকেই চশমা ভালো লাগে । চশমা পরার জন্য মিথ্যেও বলেছিলো ডাক্তারকে । অবশ্য ভাগ্য তেমন ভালো হয় নি । তবে কলেজ পাসের পর চশমা দেখলেই ঘেন্না হতো । তারপর হতো আক্ষেপ । কারণ তিলকা ।

তিলকার স্মৃতি গুলো হৃদয়ে ইজারা নিয়েছিলো তিল হয়ে থাকার শর্তে । অবৈধ দখলবাজিতে কখন যে তা তাল হয়ে ঝুলে পড়েছিলো তা টের পাওয়া গেলো বহু পরে । তবে দখলদার যে মালিকের প্রশ্রয় পেয়েছিলো তা পরিষ্কার । নয়তো হঠাৎ কেন বুকশেলফগুলো উপন্যাসে ভরে উঠবে? প্লাটোর মতো কবিতাঘৃণা হঠাৎ কেন বিলুপ্ত হবে?কেন বসে থাকতে হবে
পার্কের সবচেয়ে সুন্দর সিটটা দখল করে?

কিন্তু সেই তাল বহনের পরিপক্বতা তখনো হয়তো আসে নি ওর । তাই ঘুঁটিওয়ালা একটু ভিন্ন চাল চাললো । মাস কয়েকের মধ্যেই আশরাফের চশমাভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো । সেই চশমার সুবাদেই নাকি অন্য কারণে তা বলতে পারবো না । তবে হঠাৎ যেন সে তিলকাকে দেবী থেকে  মানবী ভাবতে শুরু করলো । সে বুঝতে শুরু করলো পাপ সেও করতে পারে । সে বুঝতে পারলো সেও পারে অন্য কারো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরতে ।

এ পাপ কি পূণ্য সে হিসেবে আর সে গেলো না । সে হিসাব ঘুঁটিওয়ালা করুক । সে শুধুমাত্র এই পাপিষ্ঠ পৃথিবীর বুকে এক দলা থুতু ছুঁড়লো । মুখে কেবল একটি অশ্লীল গালি বেরিয়ে এলো অস্ফুটে ।

২.

কদিন পর একটা চিঠি এলো । প্রেরক নয়, প্রেরিকার । নাম দেখে আর কিছু দেখলো না আশরাফ । সোজা চিঠিটা ছুঁড়ে দিলো ডাস্টবিনে । পুরোনো প্রীতির লোভে নাকি নিছক কৌতূহলে তা জানি না । ধীরে ধীরে তুললো ওটা । খামটা খুললো । চিঠি বেশ সংক্ষিপ্ত :
সব ফল থেকে গাছ হয় না । বোধহয় আমাদের ফলটাও অমনি কোনো বাতিল ফল । নয়তো আমারই যমজ বোন কেন আমাদের ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসবে স্বামীকে নিয়ে?তা আবার আমায় না জানিয়ে?সে না হয় বিধাতার দোষ । তুমি কীভাবে আমায় অবিশ্বাস করলে?
– তিলকা

উদভ্রান্তের মতো খামের গায়ে আতিপাতি করে ঠিকানা খুঁজলো । তারপর শান্ত হয়ে জানালা গলে আকাশের দিকে চাইলো । একটু আগেও চাঁদটা মাঝ আকাশে ছিলো । পরিপূর্ণ উজ্জ্বল হয়ে । তাকে গ্রাস করেছে কালো মেঘ ।

Use Facebook to Comment on this Post