চলচ্চিত্র | নারী স্বাধীনতার একটু ঝিলিক

আমি সাধারণত হিন্দি সিনেমা একদম দেখি না বললেই চলে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবে নগ্নভাবে তার প্রয়োগ ইত্যাদি নানা কারণে ভারতের প্রতি একধরনের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। কেও আমার ফোল্ডারে হিন্দি সিনেমা দিয়ে গেলেও মাসের পর মাস তা পরে থাকে। যাহোক সেটা কোনো বিষয় না, ভারতের প্রতি আমি এমন মনোভাব পোষণ করি বলে সবাইকেই যে এমন হতে হবে এমন না কিংবা আমার ধারণাটাই যে সঠিক তাও না। যে সকল সিনেমা বেশীমাত্রায় অসাধারণ হয় এবং সকল শ্রেণীর দর্শক এ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করলে মনে হয়- এই সিনেমাটা না দেখলে অসাধারণ কিছু একটা মিস করবো। অসাধারণ জিনিসগুলো আমি উপভোগ করতে চাই। এবং আমি ভারতকে পছন্দ করি আর নাই বা করি স্বীকার করে নিতেই হবে ভারতে অনেক মেধা আছে।

সেদিন দেখলাম কুইন সিনেমাটি। স্পয়লার দেয়া ঠিক হবে না তাই তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করলাম। আমি মুভির তেমন ভালো বিশ্লেষক নই। এই মুভিটি দেখে আমার মনে হয়েছে উপযুক্ত সুযোগ এবং সুবিধা দেয়া হলে একজন নারীও তার সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের মতো অবদান রাখতে পারে। পরিচালক এখানে অত্যন্ত সহজ কিন্তু দারুণ এক উপায়ে নারীর স্বাধীনতার পরিবেশটা এনেছেন। বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার ঝামেলায় অভিমানী মেয়েকে নিয়ে আসেন প্যারিসে। যেখানে নারীরা স্বাধীন। আর ভারতে আইনগতভাবে সাংস্কৃতিকভাবে সকল কিছুতেই পরাধীন। এমনকি নারীরা ঢেকুর তুললেও সেটাকে ভাল চোখে দেখা হয় না। কিন্তু পুরুষের বেলায় এমনটা নেই। কোনো পার্টিতে মেয়েরা ইচ্ছা থাকলেও সবার সাথে নাচতে পারবে না, কিন্তু পুরুষরা ঠিকই পারে। গাড়ি চালানোর ব্যাবপারে মেয়েদের ক্ষেত্রে বড় ধরণের রেস্ট্রিকশন। মেয়েরা গাড়ি চালাবে এটা অনুমোদিত না। কিন্তু সায়েন্টিফিকালি ড্রাইভিঙে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি সফল।

আমাদের সমাজে নারীকে একদমই অথর্ব হিসেবে ধরা হয়। আর নারীরাও শত শত হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষের অধীন অথর্ব থাকতে পছন্দ করে। পুরুষের মাঝে নিজের সমস্ত স্বাধীনতা অর্পণ করে পুরুষ কর্তৃক নিরাপত্তা চায়। একজন পুরুষ তার নারীর খেয়াল না করলে ঐ নারী নিজেকে নিরাপত্তাহীন বলে মনে করে। জন্ম থেকেই দাসী, এবং দাসী থাকতে পছন্দ করে। এই দাসত্ব ছেঁড়েও যে একজন নারীর পক্ষে স্বাধীন জীবন যাপন করা সম্ভব তা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অত্যন্ত স্বাভাবিক জৈবিক একটা বিষয় চুমু খাওয়া সেটাও লজ্জায় করতে পারে না ভারতের এক শহরের মেয়ে। স্বাধীন পরিবেশ পেয়ে সে এই কাজটাও করতে সাহস করে। ভারতের রাস্তায় ড্রাইভিং করার সময় যখন তার প্রিয় ছেলেটির অনেক বকা হজম করতে হয় সেখানে নিজেই অন্য সব ছেলেদের নিয়ে ড্রাইভ করতে পারে। এমনকি রাস্তাঘাট না চিনলেও অন্য কোনো পুরুষের সহায়তা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। সবই মানসিকতা। সবার আগে আমাদের মেয়েদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। একা একা নির্জন রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারী একটা মেয়ের সামনে এলে আমাদের সমাজের মেয়েরা সবার আগে বলবে- আমার গায়ে হাত দিও না, আমি নিজে থেকেই তোমাকে গয়নাগাটি খুলে দিচ্ছি। নারীর পক্ষেও যে একটা ছিনতাইকারীর সাথে লড়ে নিজের দরকারি জিনিষপত্র রক্ষা করা যায় এবং তার জন্য সুপার উইম্যান হবার প্রয়োজন নেই তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ‘কুইন’ নামের চলচ্চিত্রটি।

 

চিত্র: বিদেশের মাটিতে অচেনা তিন দেশের তিন ছেলের সাথে ভারতবর্ষের রানী। এদের সাথেই মানিয়ে নিয়ে একসাথে থেকেছিল রানী, আর পেয়েছিল অসাধারণ বন্ধুত্ব। 

 

আমাদের সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের নারীরাই জানে না আসলে তারা কোন জগতে আছে। আর আমদের সমাজটাও এখনো প্রস্তুত হয়নি মেয়েদের জন্য। কিন্তু কথা হচ্ছে প্রস্তুত না হলে তো কাওকে না কাওকে তা করে নিতে হবে। সেটাই এখন থেকে শুরু করে দিলে একসময় পরিপূর্ণতা পাবে।

কুইন সিনেমাটি অসাধারণ লাগার পেছনে একদম শেষ দৃশ্যের একটা বড়সড় ভূমিকা আছে। সামান্য একটু স্পয়েল না করে পারছি না, আশা করি এতে স্বাদ নষ্ট হবে না। মুভির শেষ দিকে দেখা যায়- যে কেন্দ্রীয় চরিত্র রানী তার প্রেমিক তাকে বিয়ে না করাতে সে নাওয়া খাওয়া ছেঁড়ে দিয়েছিল, সেই পরে প্রেমিকের বা হবু স্বামীর কাছ থেকে হাসিমুখে দূরে চলে যাচ্ছে। তাকে কত অনুনয় করছে থাকার জন্য, বিয়েটা করার জন্য, ছেলেটা তাকে অনেক ভালোবাসে এই সেই কত কী। কিন্তু কিন্তু রানী বা চলচ্চিত্রের রূপকে Queen তাকে ভালোবাসা জানিয়ে বিদায় নিয়ে আসে। ছেলেটার প্রতি তার কোনো ঘৃণা নেই, ছেলেটার কিছু কর্মকাণ্ডের কারণেই তাকে ফ্রান্স যেতে হয়েছে এবং এতে করে তার চোখ খুলে গিয়েছে। সে আর তার পায়ে পুরুষের শেকল বেধে রাখতে চায় না। নারী স্বাধীনতায় মিডিয়ার লাফালাফি দাপাদাপি ব্যক্তিজীবনে খুব বেশি কিছু এনে দিতে পারে না। সবচে বড় জিনিসটা হচ্ছে মানসিকভাবে মুক্তি পাওয়া। যেখানে আমাদের সমাজের সব মেয়েরাই পুরুষের নিরাপত্তায় থাকতে চায় সেখানে কেও একজন এই নিয়মের বাইরে গিয়ে দুর্গম পথ সুগম করতে চাইলে অবশ্যই সেটা মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অসাধারণ হয়েছে সিনেমাটি।

 

চিত্র: বিদায়ের সময় কুইন বা রানীর হাসিমুখ প্রতিনিধিত্ব করছে নারীর মানসিক স্বাধীনতা, পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা সমাজ ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিজেকে রাখা। 

 

আর সিনেমাটি মূলত আমার এই কঠিন কঠিন কথার মতো না। হঠাৎ করে বিদেশের মাটিতে একটি মেয়ে যেভাবে জীবন যাপন করে তা আসলেই উপভোগ্য। আমাদের সমাজ থেকে ফ্রান্সে বেড়াতে যাওয়া এক মেয়ের সময়ে সময়ে ঘটা কাহিনী দর্শকের জন্য অনেক আনন্দের খোঁড়াক হবে নিঃসন্দেহে। এক প্রস্টিটিউট মেয়ের সাথে সিনেমার অনেকটা সময় জুড়ে রানীর অবস্থান আরও আগ্রহোদ্দীপক করে তুলে দর্শকদের। সাথে সাথে একটি প্রস্টিটিউট মেয়ের জীবনের বাস্তবতাও এখানে ওঠে আসে।

এই সিনেমাটি ২০১৪ সালে বলিউডে অন্যতম সেরা সিনেমা। নারীকেন্দ্রিক এই সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। এক হিসেবে এটি ২০১৪ এর সবচে ব্যবসাসফল সিনেমা। ব্যবসার সাফল্য মূলত আমরা ধরে থাকি কত আয় করল তার উপর। কিন্তু আদতে সত্যিকার সাফল্য হল কত খরচ হয়েছে এবং সে অনুপাতে কত আয় করেছে তার উপর। এই সিনেমাটি স্বল্প বাজেটের কিন্তু সে তুলনায় আয় করে নিয়েছে অনেক।

এই সিনেমাতে রানী চরিত্রে অভিনয় করেছে যে মেয়েটি তার নাম যে কঙ্কনা রনৌত সেটা আমি জানতাম না। কঙ্কনার নাম আমি শুনেছিলাম সেই অনেক আগে স্কুলে থাকার সময়েই। সাইড নায়িকা হিসেবে কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করে থাকবে। তাই খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে কখনোই খেয়াল করিনি। পরে যখন উইকি-টুইকি করে মুভিটা সম্পর্কে পড়তে গিয়ে জানলাম এটা কঙ্কনা তখন খুব অবাক হলাম। অসাধারণ অভিনয় করেছে এখানে। কঙ্কনা রনৌত এর জীবন নিয়ে পড়তে গিয়ে অন্যরকমের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়ে গেল। সে একবার বলেছিল- আমি খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমি যখন অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেই তখন আমার বাবা-মা আমাকে নিয়ে শঙ্কা করেছিল। পরে আমি যখন সাফল্য অর্জন করি তখন সে ভয় কেটেছিল, এমনকি এখন আমার সমগ্র অঞ্চল আমাকে নিয়ে গর্বিত। কঙ্কনার একটি উক্তি আমার দারুণ ভাবে ভাল লেগে যায়-

My biggest asset is that I know how to learn and, I believe my wish help me in the long run.

-Kangana Ranaut

 

সময় পেলে সিনেমাটি দেখার জন্য অনুরোধ রইল।

#re

http://www.imdb.com/title/tt3322420/

http://en.wikipedia.org/wiki/Queen_(film)

http://www.imdb.com/name/nm2144007/

 

লেখকঃ সিরাজাম মুনীর শ্রাবণ, বিভাগীয় সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি।

Use Facebook to Comment on this Post