কলিংবেল রহস্য | তানজিলা আফরোজ

চারদিন হলো নতুন বাসায় উঠেছেন শাহানা জামান। সবকিছু সাজানো গোছানো তাঁকে একা হাতেই সামলাতে হচ্ছে। পরিবারের সদস্য বলতে তাঁর দুই ছেলেমেয়ে; বড় ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা গিয়েছে প্রায় তিন বছর আগে আর ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে গতমাসে। যখন ছেলেমেয়েরা খুব ছোট ছিলো তখনই বিধবা হয়েছিলেন শাহানা জামান। বর্তমানে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তিনি। বাসা থেকে ইউনিভার্সিটির দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ার মেয়ের বিয়ের একমাস পরেই কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেন তিনি।

ছোটোখাটো একটা ফ্ল্যাট; মোটামুটি দুজন মানুষ থাকার মতো। তিনি একা মানুষ; তাঁর এরকমই একটা ফ্ল্যাটের দরকার ছিলো। আশেপাশের বিল্ডিং এ মিসেস জামানের কয়েকজন পরিচিত সহকর্মীও থাকেন। এই চারদিনের মধ্যে নিজের বিল্ডিং এর প্রায় সবার সাথে কমবেশি পরিচয় হয়ে গেছে তাঁর। উপরের ফ্লোরে থাকেন খোরশেদুল মামুন নামের একজন সরকারী চাকুরীজীবী, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের তিন বছরের দুষ্টু ছেলে পাপন;
পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন বয়স্ক একজন মহিলা আর তাঁর কলেজে পড়ুয়া নাতনী; নিচের ফ্লোরে থাকে সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি। সবকিছুই ঠিক ছিলো এই নতুন জায়গায়, কেবল একটি জিনিসই শাহানা জামানকে ভাবিয়ে তুলছে গত দু’দিন ধরে।

এই ফ্ল্যাটে উঠার পরের দিন দুপুরের দিকে  কলিংবেজে বেজে ওঠে। মিসেস জামান দরজা খুলে বাইরে কাউকে না দেখতে পেয়ে ভাবেন ওপরের তলার দুষ্টু পাপন করেছে হয়তো। বিকালে কলিংবেলের আওয়াজেই ঘুম ভাঙে তাঁর। দরজা খুলে দেখেন নিচের ফ্লোরের সদ্য বিবাহিত সেই দম্পতি তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছে। সেই নবদম্পতি চলে যাওয়ার পর মিসেস জামান ভার্সিটির পরীক্ষার খাতা দেখতে বসেন। খাতা দেখা শেষ করতে করতে রাত ১১টা বেজে গেলো। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মিসেস জামান। হঠাৎ বেজে ওঠে কলিংবেল! মনে মনে ভাবছেন তিনি,এরকম সময়ে কে আসতে পারে। দরজায় এমন কোন ছিদ্র নেই যা দিয়ে বাইরে দেখা যায়। দরজায় কাছে গিয়ে জোরগলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড। কোন সাড়া নেই। মিসেস জামান একটু ঘাবড়ে গেলেন এবং আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” কিন্তু কোন সাড়াই পাওয়া গেল না। তিনি দরজা খুললেন। কিন্তু না; কেউ নেই দরজার ওপাশে। সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে একটা বেড়াল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না তাঁর। পরেরদিন ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ এবং দরজা খোলার পর কাউকে দেখা যায় না দরজার ওপাশে।

টিচার্স কমনরুমে বসে গত দু’দিনের এই ঘটনা নিয়েই ভাবছিলেন শাহানা জামান। কমনরুমে এলেন তাঁর সহকর্মী মাহমুদা। মাহমুুদা মিসেস জামানের পাশের বিল্ডিং এ থাকেন গত পাঁচ বছর যাবৎ। মিসেস জামানকে অন্যমনস্ক দেখতে পেয়ে এর কারন জানতে চেয়ে বসে মাহমুুদা।
-কি ব্যাপার! আপা? এতো চিন্তা কিসের? ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা?
-না মাহমুদা! চিন্তাটা আসলে নতুন ফ্ল্যাটের ব্যাপারে।
-কি সমস্যা, আপা? বলেন দেখি আমাকে।
-গত দু’দিন ধরে আমার বাসায় সময়ে-অসময়ে কলিংবেজ বেজে উঠছে। দরজা খোলার পর কাউকেই খুঁজে পাইনি।
-সম্ভবত কোন দুষ্টু বাচ্চাকাচ্চার কাজ হবে!
-না মাহমুুদা! কলিংবেলের সুইচ বেশ উপরে। এতো ওপরে কোন ছোট বাচ্চার হাত যাওয়া অসম্ভব!
-তাহলে কে করবে এমন কাজ?
-সেটাই তো ভাবছি, মাহমুুদা।
-আপা!?
-হ্যাঁ মাহমুদা! বলো কি বলবে।
-না মানে! জানি আপা আপনি এসবে বিশ্বাসী নন; কিন্তু তবুও হঠাৎ মনে হলো বলেই বলছি আপনাকে। তার আগে আপনি বলেন রাগ করবেন না?
-আচ্ছা ঠিকাছে করব না! এবার বলো।
-আপা! আম্মার মুখে শুনেছিলাম আপনাদের বিল্ডিং এ নাকি প্রায় সাত বছর আগে ১৬ বছরের একজন কাজের মেয়েকে খুন করা হয়।
-কি! (উত্তেজিত হয়ে) কিন্তু কেন?! কিভাবে খুন করা হয়েছিলো তাকে?
-বাসার সবাই দু’দিনের জন্য কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলো; বাসায় ছিলো কেবল কাজের মেয়েটা। গভীর রাতে একদল ডাকাত এসে বাসার কলিংবেল বাজাতে শুরু করে। অনেকক্ষণ বাজানোর পরেও যখন দরজা খোলেনি মেয়েটা, তখন ডাকাতেরা দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে। মেয়েটাকে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলে সব জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায় তারা। যাওয়ার সময় কলিংবেলটাও খুলে রেখে যায় কোন কারনে আর বাইরে তালা মেরে রেখে যায় যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। আপা! আমার মনে হয় মেয়েটার অতৃপ্ত আত্মাই আপনার বাসায় কলিংবেল বাজাচ্ছে।
-কি যে বলো না মাহমুুদা! মরা মানুষ আসবে আমার বাসার কলিংবেল বাজাতে! তুমি বরং একটু ফ্রেশ হয়ে নাও; তাহলে মাথা থেকে কলিংবেল বেজে ওঠার রহস্যটা দূর হয়ে যাবে (একটু ঠাট্টার ছলে)। আমি বরং শেষ ক্লাসটা নিয়ে আসি।
-ঠিকাছে আপা! (হতাশ কণ্ঠে)

বাসায় ফিরলেন সন্ধ্যা ৬টায়। ফিরেই ফ্রেশ হয়ে নিজের জন্য রাতের খাবার বানাতে শুরু করলেন। এমন সময় হঠাৎ বেজে ওঠে কলিংবেল! মিসেস জামান আজকে কলিংবেল বেজে ওঠার রহস্য উৎঘাটন করবেন বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে এসে দরজা খুলতেই দেখেন পাশের বাসার বৃদ্ধা আর তাঁর নাতনী হাতে ব্যাগ-স্যুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মিসেস জামানকে দেখেই তারা দুজনে কুশল বিনিময় করলেন তাঁর সাথে।
-কোথায় যাচ্ছেন আপনারা দু’জন?
-জ্বি! এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে যাচ্ছি। বাসায় তালা দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু তবুও আপনাকে একটু বলে গেলাম। যদি কোন সমস্যা মনে করেন আমার নাতনীর নাম্বার দিয়ে গেলাম; দয়া করে জানিয়ে দেবেন।
বৃদ্ধা তাঁর নাতনীকে নিয়ে চলে গেলেন।

তিনতলায় এখন মিসেস জামান ছাড়া আর কেউ নেই। সেটা নিয়ে অবশ্য বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই তাঁর। প্রতিদিনের মতো রাত বারোটার দিকে ঘুমোতে যাবেন এমন সময় আবার বেজে ওঠে কলিংবেল। দরজা খুলেই দেখেন কোথাও কেউ নেই। সিঁড়িতে কেবল একটি পোষা বিড়াল বসে আছে। হঠাৎ করে কেন যেন মিসেস জামানের একটু ভয় ভয় লাগতে শুরু করে। দ্রুত দরজা আটকে দিলেন তিনি। বিছানায় শুয়েও সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি। মনে মনে শুধু ভেবেছেন, কে করছে এরকম কাজ। পরেরদিন শুক্রবার বলে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠারও কোন চিন্তা ছিলো না। চিন্তা কেবল একটাই, “কিভাবে জানবো এই কলিংবেল রহস্য?”

লেখক পরিচিতিঃ

তানজিলা আফরোজ [Magazine Badge

ছাত্রী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। 

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a comment

Your email address will not be published.