অপ্রয়োজনীয় | কাজী মোয়াজ্জমা তাসনিম

টাকাগুলো আবার গুনল জামাল। না। ভুল গুনে নি। পুরো এক লাখই আছে। টাকাটা কার সে জানে না। তবে আবছাভাবে মনে পড়ছে সন্ধ্যা বেলা যে ভদ্রলোক ব্যাগ নিয়ে তার গাড়িতে উঠেছিল নামার সময় তার হাতে ব্যাগ দেখেনি সে। খুব সম্ভবত ব্যাগটা তারই। লোকটা কোথায় নেমেছিল স্পষ্ট মনে আছে তার। লোকটার বাসা মিরপুরে। টিয়া রঙয়ের একটা চারতলা বাড়ি। ওই এলাকায় গেলে বাসাটা খুঁজে বের করতে খুব বেশি সময় লাগবে না তার। সিএনজিটা স্টার্ট করে মিরপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে জামাল।

আধঘন্টা হল জ্যামে আটকে আছে। বিচ্ছিরি জ্যামটা ছাড়ার কোন নাম নেই। ইঞ্জিনটা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরালো। তিতকুটে লাগছে সবকিছু। সিগারেটের ধোঁয়াটাও কেমন বিস্বাদ। আধখাওয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো বাইরে। ফাতেমা গত একমাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি। ফাতেমা তার স্ত্রী। বিয়ে হয়েছে বছরখানেক হল। জামালের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ফুটফুটে একটা কিশোরী মেয়ে লাজুক মুখে ঘরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। জামালকে কিভাবে খুশি করবে সেটা নিয়ে তার চিন্তার অন্ত নেই। বাঙালি মেয়েরা জন্মগত ভাবেই স্বামীভক্ত। জামাল খেতে বসলে বারবার আড়চোখে দেখত। জামাল বুঝতে পারত সেটা। তাই রান্না খারাপ হলেও হাসিমুখেই খেয়ে যেত পুরোটা।

রাত জেগে জামালের জন্য অপেক্ষা করত ফাতেমা। বাড়ি ফিরলেই সারাদিন কী কী হয়েছে সব শুনতে হত তাকে। মুরগী নিয়ে জামিলার মায়ের সাথে রহিমার ঝগড়ার খবর দিতে দিতে হেসে গড়িয়ে পড়ত। জামাল অবাক হয়ে সেই হাসি দেখত। হাসি দেখতে দেখতে একসময় নিভে যেত সব বাতি। যেন অন্ধকার নেমে আসত পুরো পৃথিবীতেই। সেই পৃথিবীতে মাত্র দুজন মানুষ। আর কেউ নেই।

বিয়ের এক বছরের মাথায় ফাতেমার পেটে সন্তান আসে। তারপর কত প্রতিক্ষা। কত স্বপ্ন। ছেলে হবে না মেয়ে হবে এটা নিয়ে ঝগড়া করেই কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে দুজনে। কে জানত, সেই অনাগত সন্তানকে আলোর মুখ দেখাতে গিয়েই মৃত্যুর মুখোমুখি হবে ফাতেমা?

জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। আবার ইঞ্জিন চালু করল জামাল। তবে এইবার গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল। ফাতেমাকে বাঁচাতে হবে। যে করেই হোক। ফাতেমাকে বাঁচাতে হলে টাকাটা তার দরকার। সততা দিয়ে মানুষের বাহবা পাওয়া যায়। কিন্তু সেই বাহবা দিয়ে জীবন চলে না।

কাল সারারাত ঘুমান নি রফিক সাহেব। এক লাখ টাকা কম নয়। সামান্য কেরানির চাকুরি তার। টাকাটা ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নেই। হয়ত চুরির অভিযোগে চাকুরিটাই চলে যাবে তার। তখন বউ বাচ্চা নিয়ে পথে বসতে হবে। এসব সাত পাঁচ যখন ভাবছেন তখন হটাৎ কে যেন দরজায় কড়া নাড়লো। বাঙালি মধ্যবিত্তের দরজায় সাত সকালে ধাক্কা পড়া মানেই কোন দুঃসংবাদ। কে জানে কোনভাবে খবর পেয়ে পুলিশই চলে এল কিনা! তবে দরজা খোলার পর পুলিশের ভয়টা আর থাকল না। কারণ তার দরজায় যে দাঁড়িয়ে আছে সে আর যাই হোক পুলিশ না। এলোমেলো চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। পরনে একটা মলিন শার্ট আর ছেঁড়া লুঙ্গি। “স্যার, এই ব্যাগটা কি আপনের? কালকে মনে হয় আমার সিএনজিতে রাইখা আসছিলেন।” রফিক সাহেব কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। এইতো তার ব্যাগটা। হ্যাঁ এটাই সেই ব্যাগ। একসময় কালো ছিল। এখন রঙ জ্বলে গেছে। ওই যে এককোণায় সামান্য ছেঁড়াটাও দেখা যাচ্ছে। লোকটা তার হাতে ব্যাগটা দিয়েই হাঁটা শুরু করল। একবারো পেছন ফিরে তাকালো না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জামালের এখন আর টাকাটার দরকার নেই। কাল রাতে ফাতেমা মারা গেছে। এইতো, মাত্রই তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করে এল। নিচে নেমেই সিএনজি স্টার্ট করল। সে দিন আনে দিন খায়। একদিন না বেরুলে সারাদিন উপোষ করতে হবে। মানুষ না হয় দুইজন থেকে একজন হয়েছে। কিন্তু একজনের খাবার তো যোগাড় করতেই হবে!

Use Facebook to Comment on this Post

Leave a comment

Your email address will not be published.